‘কেব্ল নিউজ নেটওয়ার্ক’ নামে পরিচিত সিএনএন বিশ্বব্যাপী খ্যাত। এর প্রতিষ্ঠাতা টেড টার্নার ২৪ ঘণ্টার সংবাদ সম্প্রচারের মাধ্যমে সংবাদজগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। ৮৭ বছর বয়সে ৬ মে ফ্লোরিডায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দূরদর্শী, ব্যতিক্রমী এবং জনহিতৈষী টেড টার্নার চিরস্মরণীয় থাকবেন সিএনএনের জন্য। চ্যানেলটি যতদিন চলবে, প্রজন্মান্তরে তাঁকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা করা হবে।
সিএনএন আর কতদিন থাকবে?
সিএনএন শুরু করার সময়ই টার্নার বলে গেছেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন: “পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের সম্প্রচার বন্ধ করব না। আমরা সম্প্রচারে থাকব, আমরা পৃথিবী ধ্বংসের ঘটনাও সরাসরি কাভার করব, আর সেটাই হবে আমাদের সর্বশেষ ঘটনা, একেবারে শেষ সংবাদ।”
পৃথিবীর যেকোনো দেশে খবর পড়া বা দেখা সবার কাছে সিএনএন পরিচিত। আমি, আপনি বা অন্য যেখানেই থাকি না কেন, যেকোনো ভাষায় খবর পাই না কেন, সবাই কোনো না কোনো রূপে সিএনএনের গ্রাহক। কারণ সিএনএনের বরাতে বিশ্বের প্রতিটি সংবাদমাধ্যম প্রায় প্রতিদিন খবর পরিবেশন করে।
সিএনএন ২৪ ঘণ্টা খবর পরিবেশন করে। পৃথিবীর যেকোনো কোণে যদি সংবাদ্য ঘটনা ঘটে, তৎক্ষণাৎ তাদের কর্মীরা লাইভ কভারেজ শুরু করে। যুদ্ধ, ভূমিকম্প, অভ্যুত্থান বা নির্বাচন—কিছুই বাদ পড়ে না। সিএনএনের সঙ্গে জড়িত বিশ্বাসযোগ্যতার একটা ঐতিহ্য রয়েছে।
১৯৮০ সালের ১ জুন সিএনএন যাত্রা শুরু করে। তখন টেড টার্নার ছোট রেডিও স্টেশনের মালিক ছিলেন, সংবাদে তাঁর কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। তবু তিনি ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল চালু করেন। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী মিডিয়ায় হাসাহাসি ও নিন্দা শুরু হয়। নিন্দুকেরা এটাকে ‘চিকেন নুডলস নেটওয়ার্ক’ বলে।
গণমাধ্যমের আরেক নেতা রুপার্ট মারডক তাঁর নিউইয়র্ক পোস্টে লিখেছিলেন: ‘টার্নার কি উন্মাদ?’ আমেরিকার বিখ্যাত সংবাদপত্রগুলো প্রথম দিনেই সিএনএনের মৃত্যুবাণী জারি করে। তবে কেউ কেউ এটাকে ‘নিন্দুকপূর্ণ পৃথিবীতে বৈপ্লবিক শক্তি’ হিসেবে দেখেছিলেন।
টেড টার্নারের ‘খবরই সবকিছুর শীর্ষে’ বিশ্বাস সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। আজ প্রতিটি দেশে ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল চলে, আমাদের দেশেও একাধিক। সিএনএন শুধু ২৪ ঘণ্টার সংবাদ নয়, ‘সিএনএন হেডলাইন’, ‘ব্রেকিং নিউজ’সহ নতুন ধারা প্রবর্তন করেছে। টিভির ‘টক শো’ এসেছে ‘ক্রসফায়ার’ থেকে, ‘ল্যারি কিং লাইভ’ সাক্ষাৎকারকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ল্যারি কিং শান্তভাবে ‘বোকার’ মতো প্রশ্ন করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করতেন।
এখন সিএনএনের মালিকানা বদলাচ্ছে। বর্তমান মালিক ওয়ার্নার ব্রাদার্স থেকে এটি কিনছেন প্রযুক্তি কোম্পানি ওরাকলের মালিক ল্যারি এলিসনের ছেলে ডেভিড এলিসন। বাপ-ছেলে দুজনেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোর সমর্থক।
এলিসন প্যারামাউন্টের স্বত্বাধিকারী। স্ট্রিমিং প্রযুক্তির নেটফ্লিক্সও সিএনএন কিনতে চেয়েছিল, কিন্তু প্যারামাউন্টের সঙ্গে পেরে ওঠেনি।
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন মালিকদের অধীনে সিএনএন কি স্বাধীনতা ধরে রাখবে? খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আগের মতো আস্থা রাখা যাবে কি? নেটফ্লিক্স কিনলে অনুরাগীরা আশ্বস্ত হতো, কারণ তাদের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই।
আগেও সিএনএনের মালিকানা বদলেছে কয়েকবার। প্রতিবার শঙ্কা হয়েছে, তবু স্বাতন্ত্র্য বজায় ছিল। কিন্তু ট্রাম্প যুগে বিশ্বাস বদলে গেছে। এই বিক্রয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদন দরকার, যা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, তিনি সিএনএনের নিয়ন্ত্রণ ডেভিড এলিসনের হাতে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “ডেভিড এলিসন যত দ্রুত ওই নেটওয়ার্কের দায়িত্ব নেবেন, ততই মঙ্গল।”
রুপার্ট মারডকের ফক্স নিউজের সাবেক কর্মী হেগসেথের এই অধীরতা স্বাভাবিক। তিনি ইরান যুদ্ধের সংবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন অভিযোগ করছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, “সেক্রেটারি হেগসেথের এই বক্তব্য সিএনএনের অভ্যন্তরে এবং সংবাদমাধ্যমের অন্যান্য মহলে বিদ্যমান এই উদ্বেগকেই জোরালো করে তুলেছে যে এলিসন হয়তো নেটওয়ার্কটির সংবাদ পরিবেশনের ধারাকে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ বা ট্রাম্পের অনুকূল কোনো দিকে পরিচালিত করতে পারেন।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “সিএনএনের অভ্যন্তরে কর্মরত প্রতিবেদক ও প্রযোজকেরা এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে যদি প্যারামাউন্ট কোম্পানিটিকে অধিগ্রহণ করে নেয়, তবে তাদের সংবাদকক্ষের স্বাধীনতা, যা তাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়, তা হয়তো ক্ষুণ্ন হতে পারে।”
এই পরিস্থিতি সিএনএনের সংবাদকক্ষে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রধান নির্বাহী মার্ক টম্পসন একটি নথিতে লিখেছেন, “এই পুরো প্রক্রিয়া চলাকালে আপনারা অনেক জল্পনা-কল্পনায় পড়েছেন, তা সত্ত্বেও আমি আপনাদের পরামর্শ দেব যে যতক্ষণ না আমরা আরও বিস্তারিত জানতে পারছি, ততক্ষণ ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন না।”
সিএনএনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এলিসনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং ট্রাম্প নিয়মিত সিএনএনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করেন।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বড় মিডিয়া সিবিএসের মালিকও এলিসন, যা ক্রমশ ট্রাম্পের দিকে ঝুঁকছে। অনেকে মনে করেন, খরচ কমাতে তিনি সিবিএস ও সিএনএনের সংবাদ সংগ্রহ একীভূত করতে পারেন, যা স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে।
ভবিষ্যতে সিএনএন কি সংবাদের বিশ্বস্ততা ধরে রাখতে পারবে?
টার্নার আগেই মালিকানা ছেড়েছিলেন। তবু সিএনএন যতদিন থাকবে, তাঁর নাম জড়িয়ে থাকবে। আশা করা যাক, সিএনএন টেড টার্নারের ‘সংবাদ প্রচারে বিশ্বস্ততা’র ঐতিহ্য ধরে রাখবে।
সিএনএনের জন্ম থেকেই আমার এর সঙ্গে পরিচয়। জীবিকায় বিভিন্ন দেশ-শহরে গিয়ে সিএনএন আমার সঙ্গী ছিল। কত ঘটনা, নির্বাচন, যুদ্ধ, ব্রেকিং নিউজ লাইভ দেখেছি! ১৯৮৬ সালে নাসার চ্যালেঞ্জার স্পেস শাটল বিস্ফোরণের দৃশ্য মনে আছে—যেন চোখের সামনে ঘটল। টেড টার্নার, তোমাকে ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com






