ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণকে ইবাদত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা মানুষের মৌলিক চাহিদা। শরীর ও মন সুস্থ থাকার নামই স্বাস্থ্য। পবিত্র কোরআনে প্রকৃতি ও চিকিৎসাবিদ্যা–সম্পর্কিত আয়াত রয়েছে প্রায় ৩৬০টি এবং শুধু চিকিৎসাবিষয়ক আয়াতের সংখ্যাই প্রায় ২৪১টি।

নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকার মধ্যে রয়েছে—তা হলো সুস্থতা ও অবসর।’ (বুখারি: ৬৪১২; তিরমিজি: ২৩০৪; ইবনে মাজাহ: ৪১৭০; মিশকাত: ৫১৫৫) তিনি আরও বলেছেন: ‘তোমরা পাঁচটি বিষয়ের পূর্বে পাঁচটি বিষয়কে গনিমত মনে করবে—বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনকে, পীড়িত হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে, দারিদ্র্যের পূর্বে সচ্ছলতাকে, ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে এবং মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে।’ (বুখারি: ১০৭৭; মুসতাদরাকে হাকিম: ৭৮৪৬; মিশকাত: ৫১৭৪)

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘গোঁফ ছোট করো, বগলের পশম পরিষ্কার করো, নখ কাটো, গোপন স্থানের লোম পরিষ্কার করো এবং খতনা করো।’ (নাসায়ি: ৫২২৫; সহিহ আলবানি: ৩২৫০)

.

আরও বলেছেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা ইমানের অঙ্গ।’ (মুসলিম: ২২৩)

অপরিচ্ছন্নতা ও নোংরা পরিবেশ শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এর ফলে শরীরে নানা রোগজীবাণুর অনুপ্রবেশ ঘটে। তাই অজু ও গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের পাশাপাশি শরীরের অবাঞ্ছিত বিষয়গুলোর পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও আমাদের সচেতন থাকতে হবে। (বুখারি: ৫৮৮৯)

.
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত আমল হলো পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অসুস্থ হলে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া ও যথাযথভাবে ওষুধ সেবন করা।
.

স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষায় বাড়ির আশপাশ ও আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। রোগ প্রতিরোধে আধুনিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উত্তম; রোগপ্রতিরোধক টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণ করা ইসলামসম্মত। (আল ফিকহুল ইসলামি)

সুস্বাস্থ্যের জন্য শরীরচর্চা ও হাঁটাহাঁটি করাও ইবাদতস্বরূপ। নবীজি (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে কুস্তি লড়েছেন এবং মাঝে মাঝে দৌড় প্রতিযোগিতাও করেছেন। তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গেও অন্তত দুবার দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। তিনি সব সময় স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে দ্রুতলয়ে হাঁটতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজি (সা.)-এর চেয়ে দ্রুতগতিতে কাউকে হাঁটতে দেখিনি।’ (তিরমিজি: ৩৬৪৮)

.

রোগাক্রান্ত হলে যথাসম্ভব দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা সুন্নত। নবী করিম (সা.) সাহাবিদের দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করেছেন এবং তিনি নিজেও অসুস্থতার সময় চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার নিরাময়ের উপকরণ তিনি সৃষ্টি করেননি।’ (বুখারি: ৫৬৭৮)

স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ও পরিমিত ঘুমও ইবাদতস্বরূপ। ঘুম দৈহিক ও মানসিক প্রশান্তি আনে, মস্তিষ্কের উন্নতি ঘটায় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সুস্বাস্থ্যের জন্য রাতের পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এশার নামাজের পর অযথা গল্পগুজব করা অপছন্দ করতেন। (বুখারি: ৫৯৯)
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রাম এবং রাতকে করেছি আবরণ।’ (সুরা-৭৮ নাবা, আয়াত: ৯-১০)

রোগ প্রতিরোধে মৌসুমি ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, গোশত, ডিম ও দুধ খাওয়া নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। পবিত্র কোরআনে যেসব খাদ্যের উল্লেখ রয়েছে—খেজুর, আঙুর, ডালিম, বরই, ত্বিন (ডুমুর), জয়তুন (জলপাই), কলা, শসা, লাউ, পেঁয়াজ-রসুন, আদা, পুদিনা-ধনিয়া, ডাল, গম ইত্যাদি। (আল–কোরআন)

.

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত আমল হলো পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অসুস্থ হলে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া ও যথাযথভাবে ওষুধ সেবন করা। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় ভোর করল যে তার শরীর সুস্থ ও নিরাপদ এবং তার নিকট দিনের খাবার সঞ্চিত রয়েছে, তাহলে তার জন্য যেন গোটা দুনিয়া সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে।’ (তিরমিজি: ২৩৪৬; ইবনে মাজাহ: ৪১৪১; মিশকাত: ৫১৯১; সহিহ আলবানি: ২৩১৮)

নবীজি (সা.) যেসব খাবার পছন্দ করতেন—খেজুর, দুধ, মধু, লাউ, ডুমুর, আঙুর, কিশমিশ, ডালিম, তরমুজ, শসা, শাকসবজি, অলিভ অয়েল, মাখন, সিরকা, মাশরুম, বার্লি (যব), মিষ্টি, পনির, ঘি, রুটি, সারিদ, উট, দুম্বা, ভেড়া ও খাসির গোশত ও পায়া, মোরগের গোশত, সামুদ্রিক মাছ এবং সুপেয় পানি ইত্যাদি। (আল হাদিস)

  • অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

    সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

    smusmangonee@gmail.com