একটি মেডিক্যাল কলেজ শুধু চারদেয়ালের ক্লাসরুম আর তাত্ত্বিক বই পড়ার জায়গা নয়; এর মূল প্রাণ হলো একটি সচল হাসপাতাল, যেখানে শিক্ষার্থীরা সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে এসে হাতে-কলমে চিকিৎসাশিক্ষা (ক্লিনিক্যাল ক্লাস) গ্রহণ করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, অবকাঠামো তৈরি থাকার পরও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হাসপাতাল চালু না হওয়ায় সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা এখন ক্লাসরুম ছেড়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন।
মুক্তকণ্ঠয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে হাসপাতালের জন্য সুউচ্চ ১০ তলা ভবন নির্মিত হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা চালু করা হচ্ছে না। একটি মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকাংশই নির্ভর করে হাসপাতালের ওয়ার্ড, ওটি (অপারেশন থিয়েটার) আর জরুরি বিভাগের অভিজ্ঞতার ওপর। হাসপাতাল সচল না থাকায় এই শিক্ষার্থীরা প্র্যাকটিক্যাল বা ক্লিনিক্যাল ক্লাস থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন। হাসপাতাল ছাড়া চিকিৎসক তৈরির এই অদ্ভুত ও আত্মঘাতী প্রক্রিয়া শুধু শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারকেই ধ্বংস করছে না, বরং ভবিষ্যতে দেশের মানুষকে এক বড় ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কলেজের অধ্যক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবন থাকলেও হাসপাতাল চালু করার জন্য যে জনবল প্রয়োজন, তার অনুমোদন এখনো মন্ত্রণালয় থেকে মেলেনি। একইভাবে শিক্ষকের বহু পদ শূন্য পড়ে আছে, যার তালিকা এখন কেবল তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, একটি মেডিক্যাল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস চালুর আগে কেন জনবলকাঠামো (অর্গানোগ্রাম) চূড়ান্ত করা হলো না? কেন কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণের পরও তা বছরের পর বছর তালাবদ্ধ রেখে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হবে?
হাওরবেষ্টিত ও অবহেলিত সুনামগঞ্জ জেলার লাখ লাখ মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালটি স্থাপন করা হয়েছিল। হাসপাতালটি চালু হলে যেমন শিক্ষার্থীরা যোগ্য চিকিৎসক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পেতেন, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব মানুষকে সামান্য চিকিৎসার জন্য সিলেট বা ঢাকায় ছুটে যেতে হতো না। জনবল ও শিক্ষকসংকটের এই কৃত্রিম অজুহাতে একসঙ্গে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা এবং শত শত শিক্ষার্থীর জীবনকে স্থবির করে রাখা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এবং শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। আমরা আশা করব, দ্রুত এ মেডিক্যাল কলেজ নিয়ে সমস্যার সমাধান করা হোক।






