উনিশ শতকের দীর্ঘ সময়কালে ভারতবর্ষে কয়েকজন মনীষী সমাজচেতনার নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন। রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ—তাঁদের কর্মফলের লাভ থেকে আজ একুশ শতকেও সমাজ উপকৃত হয়ে চলেছে।

প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিবিধ বৈপ্লবিক কাজের স্বাক্ষর রেখেছেন। ধরা যাক স্বামী বিবেকানন্দর কথা। তিনি শুধু একজন সন্ন্যাসী বা ধর্ম প্রচারকই ছিলেন না; বরং তাঁকে চিহ্নিত করা যায় এক অসাধারণ চিন্তাবিদ, মানবপ্রেমী, শিক্ষাবিদ ও জাতীয় জাগরণের পথপ্রদর্শক হিসেবে।

কারণ, তাঁর জীবন ও কর্ম তৎকালীন অখণ্ড ভারতকে নতুন আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত করেছিল এবং বিশ্বসভায় ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিল।

.
১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিশ্ব ধর্মমহাসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ তাঁকে বিশ্বখ্যাত করে তোলে।
.

১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতায় স্বামী বিবেকানন্দর জন্ম। প্রথম জীবনে তাঁর পোশাকি পরিচয় ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত নামে। বাবা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং মা ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন ধর্মপ্রাণ, দৃঢ়চেতা ও স্নেহময়ী।

নরেন্দ্রনাথের শৈশবের ইতিহাস বলে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, সাহসী ও কৌতূহলী এক বালক। পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীত, শরীরচর্চা ও দর্শনচর্চায় তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পাশ্চাত্য দর্শনের সঙ্গে ভারতীয় ভাবধারারও তিনি গভীর পরিচয় লাভ করেছিলেন।

তবু তাঁর মনে বারবার যে প্রশ্ন জেগে উঠত, তা হলো ঈশ্বর কি সত্যিই আছেন? কেউ কি তাঁকে প্রত্যক্ষ করেছেন? কে দেবে এর সঠিক উত্তর?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তাঁর জীবনে আসেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। ১৮৮১ সালে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেদিন নিজের কৌতূহলকে দমিয়ে রাখতে না পেরে নরেন্দ্রনাথ সরাসরি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি কি ঈশ্বরকে দেখেছেন?’

শ্রীরামকৃষ্ণর দৃঢ় উত্তর ছিল, ‘হ্যাঁ, দেখেছি।’

এই উত্তর এবং গুরুর অকৃত্রিম স্নেহ নরেন্দ্রনাথের জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। ধীরে ধীরে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণর প্রধান শিষ্যে পরিণত হন এবং তাঁর কাছেই প্রকৃত আধ্যাত্মিক শিক্ষার দীক্ষা লাভ করতে থাকেন।

.গুরুভক্ত সাধক স্বামী বিবেকানন্দ.

১৮৮৪ সালে পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে চরম আর্থিক সংকট দেখা দেয়। অন্যদিকে শ্রীরামকৃষ্ণও তখন দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত। একদিকে সংসারের গুরুদায়িত্ব, অন্যদিকে গুরুর সেবা—এই কঠিন সময়েও নরেন্দ্রনাথ ধৈর্য ও ত্যাগের পরিচয় দেন।

১৮৮৬ সালে শ্রীরামকৃষ্ণর মহাসমাধির পর বরানগরে তরুণ শিষ্যদের নিয়ে একটি সন্ন্যাসী সংঘ গড়ে তোলেন। পরে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করে ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ নামে সর্বজন পরিচিত হন।

স্বামী বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন যে দেশের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে থাকে দেশবাসীর অভ্যন্তরে। এ কারণে সন্ন্যাস গ্রহণের পর পুরো ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলেন। তাঁর এই দীর্ঘ পরিব্রাজক জীবনে তিনি দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তের দারিদ্র্য, অশিক্ষা, সামাজিক বৈষম্য ও মানুষের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন।

.

বুঝতে পারেন, কেবল ধর্মীয় উপদেশ দিয়ে কোনো জাতির উন্নতি সম্ভব নয়; জাতির উন্নতি তখনই সম্ভব, যখন দেশবাসীর কাছে শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস, কর্মসংস্থান ও চরিত্র গঠন প্রধান হয়ে থাকে।

তাঁর মতে, মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তোলাই মানবসম্পদের পুনর্জাগরণের প্রথম শর্ত।

১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিশ্ব ধর্মমহাসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ তাঁকে বিশ্বখ্যাত করে তোলে। সেদিন বিশ্বসভায় ‘আমার আমেরিকার ভগিনী ও ভ্রাতৃগণ’ সম্বোধনের মধ্য দিয়ে মানবধর্ম, সহিষ্ণুতা ও সর্বধর্মসমন্বয়ের যে বাণী তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, আজও তা বিশ্ববাসীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

তিনি পাশ্চাত্যের সামনে ভারতীয় বেদান্ত দর্শনের সর্বজনীন আদর্শকে তুলে ধরেন। পাশাপাশি প্রমাণ করেন যে ভারতবর্ষ কেবল প্রাচীন ঐতিহ্যের দেশ নয়, বিশ্বমানবতার এক গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শকও।

.শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব.

১৮৯৭ সালে দেশে ফিরে স্বামীজি ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মূল আদর্শ ছিল—‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’, অর্থাৎ নিজের মুক্তির পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ত্রাণ, গ্রামীণ উন্নয়ন ও মানবসেবাকে ধর্মচর্চারই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি প্রাণপাত করেছেন।

পরে বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এমন একটি সন্ন্যাস আদর্শ গড়ে তোলেন, যেখানে আধ্যাত্মিক সাধনা ও সমাজসেবা সমান গুরুত্ব পায়। আজও বিশ্বজুড়ে রামকৃষ্ণ মিশনের কর্মকাণ্ডে এই লক্ষ্য পরিলক্ষিত হয়।

.
মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ১৯০২ সালের ৪ জুলাই স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে মহাসমাধি লাভ করেন। কিন্তু তাঁর জীবনাদর্শ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
.

বিবেকানন্দর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের মর্যাদা। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরীয় শক্তি নিহিত রয়েছে। তাই নিজেকে দুর্বল বা অসহায় না ভেবে নিজের শক্তির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে প্রত্যেকটি মানুষকে।

এ আদর্শেই তিনি সবার কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, ‘ওঠো, জাগো এবং এগোও!’ আজও এই শাশ্বত বাণী যুবসমাজকে কর্ম, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের শিক্ষায় দীক্ষিত করে। নারীশিক্ষা, সাধারণ মানুষের শিক্ষা, জাতীয় চরিত্র গঠন ও মানবসেবার ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্ব আধুনিক ভারত নির্মাণে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ গড়ে তোলাও ছিল বিবেকানন্দর অন্যতম কৃতিত্ব। তিনি পাশ্চাত্যকে ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আবার ভারতীয়দের পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবতাবাদ ও আধুনিক শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শেখান।

তাঁর কাছে ধর্ম ছিল বিভেদের নয়, ঐক্যের শক্তি; মানবসেবাই ছিল ঈশ্বরসেবার শ্রেষ্ঠ পথ।

মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ১৯০২ সালের ৪ জুলাই স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে মহাসমাধি লাভ করেন। কিন্তু তাঁর জীবনাদর্শ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আত্মবিশ্বাস, মানবপ্রেম, কর্মযোগ, সর্বধর্মসমন্বয় ও জাতীয় পুনর্জাগরণের যে বাণী তিনি রেখে গেছেন, তা কেবল ভারতের নয়, পুরো বিশ্বের কাছে অমূল্য সম্পদ।

তাই স্বামী বিবেকানন্দ শুধু একজন মহান সন্ন্যাসী নন, তিনি বিশ্বমানবতার এক চিরন্তন প্রেরণার উৎস।

  • দীপান্বিতা দে : শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা ও প্রাবন্ধিক

.গৌতম বুদ্ধ: রাজকুমার থেকে বোধিপ্রাপ্তির মহাযাত্রা