রাজশাহীতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে রিকশাচালক গোলাম হোসেন নিহত হওয়ার ১৫ মাস পরও হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। এরই মধ্যে দীর্ঘদিন ‘আড়ালে’ থাকার পর মামলার বাদী ও নিহত ব্যক্তির স্ত্রী পরি বানু ফিরে এসে বলছেন, তিনি আর মামলা চালাতে চান না।
মামলার বাদীর দাবি, মামলা না চালানোর জন্য তাঁকে টাকা দিয়ে আপসের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বিএনপির এক নেতার সেই প্রস্তাবে রাজি হওয়ায় তিনি কিছু টাকা পেয়েছেন। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার পর বাকি টাকা পাবেন। তবে টাকার বিনিময়ে মামলার আপসের চেষ্টার অভিযোগ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন বিএনপি নেতারা। পুলিশ বলছে, মামলার তদন্ত শেষের দিকে, আপসের চেষ্টার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে এক পক্ষের লোকজন রিকশাচালক গোলাম হোসেনকে প্রতিপক্ষের লোক মনে করে ছুরিকাঘাত করেন। রাজশাহী নগরের দড়িখরবোনা এলাকায় গত বছরের ৬ মার্চ এ ঘটনা ঘটে। পাঁচ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১১ মার্চ গোলাম হোসেন মারা যান।
.গোলাম হোসেনের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার সাহেবপাড়ায়। ছয় বছর বয়সে মা-বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মামা তাঁকে রাজশাহীতে এনে এতিমখানায় রেখেছিলেন। কিছুটা বড় হওয়ার পর এতিমখানা থেকে ফিরে মামার বাড়িতেই মানুষ হন। মামা নূরু চৌধুরী মোহনপুরের মেয়ে পরী বানুর সঙ্গে গোলামের বিয়ে দিয়েছিলেন। গোলাম কোনো রাজনীতি করতেন না, সংসার চালাতেন রিকশা চালিয়ে। ঘটনার তিন বছর আগে তাঁর মেয়ে রাখি আক্তারের বিয়ে দেন। ধার-দেনা করে ছেলে রাকিবুল হাসানকে দুবাই পাঠিয়েছেন। স্ত্রীকে নিয়ে ১০ বছর ধরে নগরের দড়িখড়বোনা রেললাইনের পাশে দুই হাজার টাকায় একটি টিনের ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন।
.গোলাম হোসেন হত্যার ঘটনায় গত বছরের ১৩ মার্চ নগরের বোয়ালিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন স্ত্রী পরি বানু। এই মামলা করার পরে শহর ছেড়ে তিনি গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। এ জন্য তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনও বন্ধ ছিল। এক মাস আগে পরিবানু রাজশাহী শহরে ফিরেছেন।
মামলায় এজাহারে নগরের শাহ মখদুম থানা বিএনপির আহ্বায়ক সুমন সরদার, চন্দ্রিমা থানা বিএনপির আহ্বায়ক ফাইজুর হক, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেক, মহানগর মহিলা দলের সহক্রীড়া সম্পাদক লাভলী খাতুনের স্বামী সোহেল রানা, লাভলীর ভাই মো. নাঈম এবং যুবদল কর্মী রনির নাম রয়েছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ মামলার এজাহারনামীয় বা তদন্তে প্রাপ্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার করতে পারেনি। যদিও আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। এ নিয়ে গত বছর ১৮ মার্চ মুক্তকণ্ঠতে ‘বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ/রাজশাহীতে রিকশাচালক হত্যা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরছেন, পাচ্ছে না পুলিশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
.মামলার তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাছুমা মুস্তারী বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাকে জানিয়েছেন তদন্ত প্রায় শেষের দিকে। অল্প সময়ের মধ্যেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
.রাজশাহীতে রিকশাচালক হত্যা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরছেন, পাচ্ছে না পুলিশ.হত্যা মামলাটির এজাহারভুক্ত আসামি ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেকের ‘ডেরা’ থেকে গত ২১ জুন ফয়সাল বাঁধন নামের এক যুবককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর মীর তারেক বাসা থেকে পালিয়ে যান। পরে পুলিশ অবৈধ পিস্তল, ম্যাগাজিন, গুলির খোসা, ককটেল ও বিস্ফোরক উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর গত ২৭ জুন দিবাগত রাতে নগরের নিউমার্কেট এলাকার একটি বাসায় অবস্থান করছিলেন মীর তারেক। তখন বিপুলসংখ্যক পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এ সময় নেতা–কর্মীরা নিচে এসে পুলিশকেও ঘিরে ফেলে স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে পুলিশ সরে যায়। পরে মধ্যরাতে নেতা–কর্মীরা ভবনের তালা ভেঙে মীর তারেককে বের করে নিয়ে যান। গোলাম হোসেন হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত এই আসামি এখন পর্যন্ত জামিনও নেননি—একজন সাংবাদিক এই প্রসঙ্গ তুললে ভবনের নিচে অবস্থানকারী মীর তারেকের একজন সহকর্মী দাবি করেন যে ওই মামলা তো আপস হয়ে গেছে।
.রাজশাহীতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত রিকশাচালকের মৃত্যু.এই তথ্য পেয়ে পরদিন সকালে (রোববার) নগরের রেলগেট এলাকায় গিয়ে পরি বানুর দেখা পাওয়া যায়। আপসের বিষয়টি শোনার পরে পরি বানুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো তিনি সব খুলে বলেন। পরি বানু বলেন, যখন শহরে ছিলেন না তখন মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন-অর-রশিদ তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ডেকে পাঠান। তিনি তার চেম্বারে গিয়ে দেখা করেন। পরিবানু বলেন, ‘আমাকে তিনি বললেন “তুমি কি মামলা চালাতে পারবা? মামলা তুমি চালাবা? না চালালে কিছু টাকা নিয়ে আপস করে নাও।” আমি তখন কিছুদিন সময় নিই। পরে তিনি আবার ডেকে পাঠান। এবার এসে চিন্তাভাবনা করে আমি জানাই যে মামলা চালাব না। তখন আমাকে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে।’
.আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার নিয়ে রাজশাহীতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৪.কত টাকা দেওয়া হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলেননি। তবে বলেছেন, ‘টাকা দিয়েছে। মামুন নিজেই টাকা বুঝিয়ে দিয়েছেন। একটা কাগজে কী যেন লেখা ছিল, তাতে সই দিতে হয়েছে। কাগজটা আমাকে দেয়নি। পরে দুজনের সঙ্গে আমাকে থানায় পাঠানো হয়েছিল তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে। তদন্ত কর্মকর্তাকে আমি আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে এসেছি।’
পরি বানু আরও জানান, যে টাকা পেয়েছেন, তা দিয়ে মেয়ের নামে গ্রামে দুই কাঠা জমি কিনেছেন। আরও দেড় লাখ টাকা পাবেন। আদালতে যেদিন মামলা নিষ্পত্তি হবে সেদিন এ টাকা পাবেন। টাকা না দিলে কী করবেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না দিলে না দিবে।’একটু থেমে আবার বলেন, ‘টাকা দিবে।’
এই মামলা আপসের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন-অর-রশিদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।’ পরি বানুর দাবির বিষয়েও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে মামলার আসামি শাহ মখদুম থানা বিএনপির আহ্বায়ক সুমন সরদার ও চন্দ্রিমা থানা বিএনপির আহ্বায়ক ফাইজুর হক তাদের অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ (এ) ধারামতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এই পর্যায়ে মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য আবেদন করেছেন।
আপসের ব্যাপারে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা নগরের বোয়ালিয়া থানার উপপরিদর্শক আমিনুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাননি।
জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপকমিশনার গাজিউর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হত্যা মামলা আপসযোগ্য নয়। এর বেশি তিনি আর কিছু বলতে চাননি।
.রাজশাহীতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহতের ঘটনায় দুই নেতাকে বহিষ্কার





