আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ‘নিখোঁজ’ হওয়া সুখরঞ্জন বালিকে গুমের মামলায় অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. ফজলুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আজ শুক্রবার বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম এ আদেশ দেন। তবে শুনানির সময় ফজলুরকে এজলাসে হাজির করা হয়নি। তিনি আদালতের হাজতখানায় ছিলেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বাড্ডার নিজ বাসা থেকে ফজলুরকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরে তাঁকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আজ ফজলুরকে আদালতে হাজির করে সুখরঞ্জন বালিকে গুমের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা মো. হেলালুল ইসলাম।

.

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসে ২০১২ সালে ‘নিখোঁজ’ হন সুখরঞ্জন বালি। ওই মামলায় ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সাজা কমিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ও বর্তমান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সুখরঞ্জন বালি তাঁর আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পুরোনো হাইকোর্ট ভবনের প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছান। এ সময় সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে গাড়ি থেকে জোর করে নামিয়ে একটি সাদা ডাবল কেবিন গাড়িতে তুলে নিয়ে যান।

.সাঈদীর পক্ষের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে গুমের ঘটনায় সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার.

আবেদনে আরও বলা হয়, এরপর সুখরঞ্জন বালিকে চোখ বেঁধে প্রায় দুই মাস একটি অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরে তাঁকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভারতের দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ বছর আটক থাকার পর বিষয়টি দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তাঁর ছেলে অপূর্ব বালি ভারতে গিয়ে তাঁকে জামিনে মুক্ত করে দেশে নিয়ে আসেন।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখা গেছে, ঘটনার দিন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দুটি ডাবল কেবিন গাড়িতে করে ফজলুর রহমান ও তাঁর সঙ্গে থাকা সদস্যরা সুখরঞ্জন বালিকে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ থেকে তুলে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে যান। পরে তাঁকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তদন্তে এ ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন।

.গুম অবস্থায় যেভাবে ভারতের কারাগারে সুখরঞ্জন বালি.

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পিরোজপুরের বাসিন্দা সুখরঞ্জন বালি ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে নিখোঁজ হন। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাঁকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। তবে তাঁর পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, তাঁকে ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তুলে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই বছরের ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন সুখরঞ্জন বালি। অভিযোগে তিনি বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো এবং পরে তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তাঁকে গুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

.

ওই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক এ টি এম ফজলে কবির, সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নামও রয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

.শেখ হাসিনাসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে গুমসহ ভারতে বন্দী রাখার অভিযোগ সুখরঞ্জন বালির