প্রতিবছর ২৬ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস। এবারও সারা দেশে এ দিবস পালিত হয়েছে।

মাদকাসক্তি আজ এমন একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। জাতিসংঘ ১৯৮৭ সালে এ দিবস ঘোষণা করার মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছিল—মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, এটি মানবকল্যাণ, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

আজকের পৃথিবীতে মাদক সমস্যার রূপ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জটিল। প্রযুক্তির উন্নয়ন যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি অপরাধচক্রগুলোকেও দিয়েছে নতুন সুযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন ক্রেতা খুঁজে নিচ্ছেন। একসময় যেসব মাদক নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো এখন আন্তর্জাতিক বাজারে সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সিনথেটিক মাদক, ইয়াবা, আইস, ফেন্টানিল ও অন্যান্য রাসায়নিক মাদক বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

.

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের তরুণ সমাজের একটি অংশ নানা কারণে মাদকের ঝুঁকিতে পড়ছে। কখনো কৌতূহল, কখনো বন্ধুদের প্রভাব, কখনো মানসিক চাপ, আবার কখনো হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা একজন তরুণকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। অনেকেই সাময়িক স্বস্তির আশায় মাদক গ্রহণ শুরু করলেও ধীরে ধীরে তা মাদক ব্যবহার ব্যাধি নামক মানসিক ব্যাধিতে রূপ নেয়। ফলে শিক্ষা ও কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও মানসিক সুস্থতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মাদকাসক্তিকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, আসক্তি একটি জটিল কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যগত অবস্থা। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি অপরাধী নন, তিনি একজন মানুষ—আমাদের সংবিধান অনুযায়ী তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অধিকার রয়েছে। তাই তাঁকে ‘খারাপ বন্ধু’, ‘খারাপ ছেলে বা মেয়ে’ নামে উপস্থাপন করা মানে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা। এই উপলব্ধি সমাজে যত দ্রুত বিস্তার লাভ করবে, তত দ্রুত আমরা কার্যকর বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক প্রতিরোধ ও পুনরুদ্ধারের পথে এগোতে পারব। একজন মানুষ যখন চিকিৎসা, পরিবার ও সমাজের সমর্থন পান, তখন তাঁর সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।

.

মাদক প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি পরিবার। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তাঁর আবেগ ও মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীলতা এবং নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, জীবনদক্ষতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ইতিবাচক সামাজিক সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

মাদক সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অবৈধ পাচার। আন্তর্জাতিক মাদক চক্রগুলো কেবল মাদক ব্যবসার সঙ্গেই জড়িত নয়, তাদের সঙ্গে অর্থ পাচার, সহিংসতা, দুর্নীতি ও অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধও সম্পর্কিত। ফলে মাদকবিরোধী কার্যক্রম একটি দেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। এ জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ, তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে আশার কথা হলো বিশ্বব্যাপী মাদক প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনী উদ্যোগ গড়ে উঠছে। বিভিন্ন দেশে কমিউনিটি–ভিত্তিক পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, যুব উন্নয়ন কর্মসূচি ও পরিবারকেন্দ্রিক হস্তক্ষেপ ইতিবাচক ফলাফল দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—এই তিন স্তম্ভকে সমান গুরুত্ব না দিলে মাদক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।

.

এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘ওয়ার্ল্ড ড্রাগ প্রবলেম: পারসিসটিং ইস্যু, নিউ চ্যালেঞ্জ, ইনোভেটিভ রেসপন্সেস’ আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। বৈশ্বিক মাদক সমস্যা আজ নিত্যনতুন রূপ ধরে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। এসব বাধা অতিক্রম করতেও প্রয়োজন উদ্ভাবনী সমাধান। একজন মানুষকে মাদক থেকে দূরে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যাঁরা ইতিমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়েছেন, তাঁদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। একটি মানবিক সমাজ কখনো কাউকে চিরতরে ব্যর্থ বলে ঘোষণা করে না, বরং তাঁকে নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেয়।

তবে মাদকাসক্তিকে মানসিক ব্যাধি হিসেবে চিনে চিকিৎসা শুরু করাটা আমাদের দেশে এখনো অনেক কঠিন। মানসম্মত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়, বারবার রিল্যাপস, সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের অপ্রাপ্যতা, প্রচলিত আইন অনুসারে অপরাধীকরণ সর্বোপরি দিবসভিত্তিক এক গাদা মৌখিক আশ্বাসে যেন সবকিছু থেমে যায়। যে মরণ ব্যবসার আকার কয়েক লাখ কোটি টাকা। প্রতিবছর সেখানে বছরে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা খরচ করে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্পন্ন নয়।

আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে আমাদের প্রত্যাশা হোক এমন একটি সমাজ, যেখানে তরুণেরা স্বপ্ন দেখবেন, পরিবারগুলো নিরাপদ থাকবে, চিকিৎসাসেবা সবার জন্য সহজলভ্য হবে এবং মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজ একসঙ্গে অবস্থান নেবে। কারণ, শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম একটি প্রজন্মই পারে একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে।

  • ডা. মো. রাহেনুল ইসলাম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সেন্ট্রাল ড্রাগ অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট সেন্টার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ঢাকা