কুষ্টিয়ায় গড়াই নদ খনন প্রকল্পের বালু অপসারণের সময় দুর্বৃত্তদের গুলিতে চারজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের জুগিয়া এলাকায় গড়াই নদের তীরে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। স্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁদের উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।

আহত ব্যক্তিদের হলেন ট্রাকচালক ফিরোজ হোসেন (৪২), বালুশ্রমিক সবুজ (৩০), বালু অপসারণের কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মিলন (৩৫) ও খননযন্ত্রের চালক বাবলা (৪০)। গুরুতর আহত বালুশ্রমিক সবুজকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আজ সোমবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ইকবাল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, রাতেই চারজন আহত ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে ফিরোজ ও সবুজ গুলিবিদ্ধ ছিলেন। সবুজের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বাকিদের এই হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ট্রাকচালক ফিরোজ হোসেন অভিযোগ করেন, জুগিয়া এলাকায় বালু অপসারণের কাজ চলাকালে ১০–১৫ জন সশস্ত্র ব্যক্তি এসে শ্রমিকদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে তিনিসহ সবুজ গুলিবিদ্ধ হন। এ ছাড়া মিলন, বাবলাসহ আরও কয়েকজনকে মারধর করা হয়। হামলাকারীরা প্রায় ১৫–২০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের গড়াই নদ খনন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় নদের পাশে স্তূপ করে রাখা বালু অপসারণের ইজারা পেয়েছিলেন কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের (জুগিয়া-দরগাপাড়া) সহসভাপতি সাবেক কাউন্সিলর মহিদুল ইসলামের মালিকানাধীন ‘মেহেদী এন্টারপ্রাইজ’। ২০২৪ সালের মে মাস থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় গড়াই নদ খনন করা বালু অপসারণের ইজারা পান তিনি। তবে বালু অপসারণ সঠিক সময়ে না করতে পেরে ওই প্রতিষ্ঠান পাউবোর কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করে। এরই মধ্যে গণ-অভ্যুত্থানের পর ওই আওয়ামী লীগ নেতা পালিয়ে যান। পাউবো সময়ও বাড়ায় না। এরই মধ্যে মেহেদী এন্টারপ্রাইজের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে মামলা করে সময় বাড়ানোর দাবি করা হয়। আদালত পাউবোকে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে বলে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জেলা পানিসম্পদ ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা কমিটি চলতি বছরের মে মাস থেকে পরবর্তী ৯ মাসের জন্য পুনরায় বালু অপসারণের অনুমতি দেয়। এরপর থেকে বালু অপসারণ চলতে থাকে।

পাউবো ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ওই ইজারার পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (ক্ষমতা) কুষ্টিয়া পৌর বিএনপির সভাপতি এ কে বিশ্বাস বাবুর কাছে হস্তান্তর করা হয়। বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় ব্যক্তিদের ধারণা।

কুষ্টিয়া পৌর বিএনপির সভাপতি এ কে বিশ্বাস বলেন, আগের ইজারাদারের কাছ থেকে তাঁরা কাজটি কিনে নিয়েছেন। বালু অপসারণের সময় দুর্বৃত্তরা শ্রমিকদের ওপর হামলা ও গুলি চালিয়েছে। বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করছে।

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশে জেলা পানিসম্পদ ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার সিদ্ধান্তমতে সবকিছু করা হয়েছে। একজন বালু অপসারণের জন্য চলতি মে মাস থেকে পরবর্তী ৯ মাস সময় পেয়েছেন। তাঁদের লোকজনই বালু অপসারণের কাজ করছেন।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, গুলির করার ঘটনা নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে ধারণা করছেন, চরমপন্থীরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও বালুঘাট দখল নিতে এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।

কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মাতব্বর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ কাজ করছে এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত চলছে।’