ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র হলেও অর্থনীতি ও বাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বহাল রয়েছে। পরিবর্তিত এই বিশ্ববাস্তবতায় অর্থনীতির পুনর্গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশকে জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবমুখী ও কৌশলগতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে।

আজ শনিবার এক গোলটেবিল আলোচনায় সরকার, বিরোধী দলের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা এমন মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক বাস্তবতায় পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকেও কৌশলগত প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে।

‘পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন)। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল বৈঠকের প্রচার সহযোগী মুক্তকণ্ঠ

.
বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতাকে ধারণ করে বলেই ব্রিকস, আসিয়ান, এসসিও এবং আরসেপের মতো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক জোটে যোগ দিতে গভীরভাবে আগ্রহী।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা
.

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিক নীতিতে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতাকে ধারণ করে বলেই ব্রিকস, আসিয়ান, এসসিও এবং আরসেপের মতো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক জোটে যোগ দিতে গভীরভাবে আগ্রহী। তাই মধ্যম শক্তি বা ‘মিডিল পাওয়ার’ হিসেবে অবস্থান সুদৃঢ় করতেই বর্তমান সরকার এসব জোটে সদস্যপদ গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে এগোচ্ছে সরকার। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় ঋণ বা সাহায্যের পরিবর্তে সরকার শিল্পায়ন ও উৎপাদনমুখী সরাসরি বিনিয়োগ এবং মুক্ত বাণিজ্যচুক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন ‘টু প্লাস টু’সহ নানা উপায়ে বৈশ্বিক অংশীদারত্বের কৌশলগত উন্নয়ন ঘটাচ্ছে।

.
চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে পারস্পরিক লাভ এবং দেশের মানুষের কল্যাণ।
শামা ওবায়েদ ইসলাম, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
.

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বৈঠকে বলেন, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে পারস্পরিক লাভ এবং দেশের মানুষের কল্যাণ। সম্পূর্ণ জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করেই এই দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নির্ধারণ করা হবে।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গ টেনে শামা ওবায়েদ বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অন্ধভাবে কোনো দেশের পক্ষে বা বিপক্ষে না গিয়ে সম্পূর্ণ কৌশলগত ভারসাম্যের মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সরকার একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি ও শ্রমবাজার বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে কোনো সমস্যা বা মতভেদ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের নীতিতে বাংলাদেশ বিশ্বাস করে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্যঘাটতি ও পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি।

.

ঢাকা–১৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে উচ্চাভিলাষী পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো কৌশলগত বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সংসদকে আরও কার্যকর করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে নীতিনির্ধারণে অর্থবহ ভূমিকা পালনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

মীর আহমদ বিন কাসেম মনে করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক, স্বাধীন এবং আরও সক্রিয়। কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা অস্থির ও পরিবর্তনশীল হলেও এর মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চাপের মুখে থাকলেও বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সতর্ক থেকে নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

.

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুবুজ্জামান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত বহুপাক্ষিকতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা। এ জন্য সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান অমীমাংসিত বিষয়, বিশেষ করে অশুল্ক বাধা ও অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় গঠনমূলক সম্পৃক্ততা জোরদার করা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তিত হতে থাকলেও এখনো চূড়ান্ত কোনো রূপ ধারণ করেনি। কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও বাণিজ্য আর অর্থনৈতিক সম্পর্কের নিরিখে এই দেশগুলোর একের সঙ্গে অন্যের আন্তনির্ভরশীলতা রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে বাংলাদেশের অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার এবং কূটনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, বাংলাদেশে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংযুক্তি বাড়াতে চীনা ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বেড়েছে। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর সুবিধা জাতীয় স্বার্থে ইতিবাচক হলে তা কাজে লাগানো উচিত।

.মধ্যম শক্তি হিসেবে অবস্থান সুদৃঢ় করতে বিভিন্ন জোটে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশ: রাশেদ তিতুমীর.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগের দুয়ার খুলে দিয়েছে। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় শুধু ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশকে বাস্তবমুখী, কৌশলগত বহুমুখী সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ সব অংশীদারের সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনার শুরুতে আয়োজনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বক্তব্য দেন ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক সফিকুর রহমান। তিনি বলেন, উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদনে দ্রুত অগ্রগতির মাধ্যমে চীন এখন আর শুধু অনুসরণকারী অর্থনীতি নয়, বরং একটি ‘ফ্রন্টিয়ার ইকোনমি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যান (ইভি) ও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তি খাতে চীনের উত্থান বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, যার প্রভাব উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের মতো দেশেও পড়বে।

গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী। আলোচনা শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন মুক্তকণ্ঠর উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়া।

.বাংলাদেশ কী পাবে, তার ওপর ঠিক হবে প্রত্যেক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী