চলতি বছরে পাঁচটি দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। দেশগুলো হলো শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, জর্ডান ও মাইক্রোনেশিয়া। এ ছাড়া নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে আফ্রিকার টোগো।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে এসব দেশের উন্নতি হয়েছে। কোনো দেশই নিম্ন আয়ের শ্রেণিতে নামেনি। বাংলাদেশেরও অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ এখনো নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, বাংলাদেশের গড় মাথপিছু আয় এখন ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার।
বিশ্বব্যাংকের সদস্যভুক্ত ২১৮টি দেশ ও অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এ প্রতিবেদন করে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংক নিজেদের সদস্যদেশগুলোকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে চার শ্রেণিতে ভাগ করে। এগুলো হলো নিম্ন, নিম্নমধ্যম, উচ্চমধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশ। এর ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক ঋণের পরিমাণ, শর্তসহ অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণ করে।
.নতুন সীমা
মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে এ বছরের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী এক বছরে বিশ্বব্যাংক কোন দেশ কোন শ্রেণিতে, তা নির্ধারণের জন্য নতুন সীমা নির্ধারণ করেছে। এখন থেকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১ হাজার ১৭৫ ডলার হতে হবে। নিম্নমধ্যম থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ৪ হাজার ৬৩৫ ডলার হতে হবে। আর উচ্চ আয়ের দেশে যেতে হলে ১৪ হাজার ৩৭৫ ডলার মাথাপিছু আয় হতে হবে।
উন্নতি করা দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন কারণে এই নতুন শ্রেণিতে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে তা তুলে ধরা হয়েছে।
ভিয়েতনাম: প্রবৃদ্ধির গল্প
বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্ধী দেশ ভিয়েতনাম। রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলের ওপর ভর করে ভিয়েতনাম শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৪ ও ২০২৫—উভয় বছরেই দেশটির রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের বেশি। একই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যথাক্রমে ৭ ও ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) গড়ে বছরে ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম উদাহরণ। দেশটি উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে।
.ফিলিপাইন: অর্থনীতির সার্বিক সম্প্রসারণ
ফিলিপাইন অর্থনীতির ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে দেশটির জিডিপি গড়ে বছরে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি কোনো একক খাতের উল্লম্ফনের ফল নয়; বরং অর্থনীতির প্রায় সব প্রধান খাতেই উন্নতির প্রতিফলন।
শ্রীলঙ্কা: সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
২০২২ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে দেশটি প্রায় ধসে পড়ার তিন বছরের মাথায় শ্রীলঙ্কা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি ৫ শতাংশ বেড়েছে। শিল্প, আর্থিক সেবা ও পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হওয়া দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও পুনরুদ্ধারের প্রতীক হলেও তারা নির্ধারিত সীমা অল্প ব্যবধানে অতিক্রম করেছে।
মাইক্রোনেশিয়া: ধীর কিন্তু স্থিতিশীল অগ্রগতি
দীর্ঘ কোভিড-১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধারপ্রক্রিয়ার পর মাইক্রোনেশিয়া ধীর ছিল। কিন্তু স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। নির্মাণ ও কৃষি খাত ছিল এ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। তবে নিট প্রাথমিক আয়ের উল্লেখযোগ্য পতন সামগ্রিক অগ্রগতিকে কিছুটা সীমিত করেছে।
.জর্ডান: পরিসংখ্যান সংশোধনের প্রভাব
জর্ডানের জাতীয় হিসাব পুনর্নির্ধারণ করার ফলে দেশটি নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগ নতুন জরিপ, অতিরিক্ত তথ্যসূত্র এবং উন্নত জাতীয় হিসাব প্রণয়নপদ্ধতি ব্যবহার করে দেখতে পায়, দেশটির অর্থনীতির আকার আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বড়। এর সঙ্গে ২০২৫ সালে ২ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যুক্ত হওয়ায় দেশটি স্পষ্টভাবে উচ্চতর আয়ের সীমা অতিক্রম করে।
টোগো কেন উন্নতি করল
টোগো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। তবে এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল জনসংখ্যার নতুন হিসাব। ২০২২ সালের আদমশুমারির বিস্তারিত ফল প্রকাশের পর দেশটির জনসংখ্যার অনুমান ১১ দশমিক ৭ শতাংশ কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়। যেহেতু মাথাপিছু আয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়, তাই জনসংখ্যা কমে গেলে মোট আয় অপরিবর্তিত থাকলেও মাথাপিছু আয় বেড়ে যায়।
২০২৫ সালে দেশটির জিডিপি ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে এবং বিনিময় হারেও কিছু প্রভাব ছিল, তবে নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে জনসংখ্যার সংশোধিত হিসাবই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
.পরিমাপের পদ্ধতি
বিশ্বব্যাংক মাথাপিছু জাতীয় আয় পরিমাপ করে থাকে যে পদ্ধতিতে, তাকে বলা হয় অ্যাটলাস মেথড। একটি দেশের স্থানীয় মুদ্রার মোট জাতীয় আয়কে (জিএনআই) মার্কিন ডলারে রূপান্তর করা হয়। এই রূপান্তর হয় অ্যাটলাস পদ্ধতিতে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে তিন বছরের গড় বিনিময় হারকে সমন্বয় করা হয়। যাতে করে আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওঠানামা সমন্বয় হয়। এ কারণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব আর বিশ্বব্যাংকের হিসাব এক হয় না।






