এই বুঝি আষাঢ়ের চরিত্র!

রোদঝলমলে আকাশ মুহূর্তেই মেঘে ঢেকে গেল। ঘন কালো মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল ‘আষাঢ়ের মার্তণ্ড’। টিপটিপ বৃষ্টির ফোঁটায় গাছের পাতাগুলো দুলতে লাগল। টিলায় নিশ্চিন্তে ঘাস খেতে থাকা দুটি গরু বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কাঁঠালগাছের নিচে আশ্রয় নিল।

বিছানায় শুয়ে ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে প্রকৃতির এই রূপান্তর দেখছিলাম। আর তো বিছানায় পড়ে থাকার উপায় নেই। এ যে বহু প্রতীক্ষিত বৃষ্টি, তাকে একটু ছুঁয়ে না দেখলে কি হয়!

কয়েক বছর ধরে শ্রীমঙ্গলে এলেই আমার ঠিকানা শান্তিবাড়ি ইকো রিসোর্ট। এবার অবশ্য তাদের আমন্ত্রণেই আসা। পরিবেশ দিবস উপলক্ষে মাসব্যাপী ‘জুন ফর গ্রিন’ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে রিসোর্টের প্রতিষ্ঠাতা তানভীর আরেফিন লিংকন নানা অঙ্গনের মানুষকে একত্র করেছেন। আছেন লেখক ও অ্যান্টার্কটিকা অভিযাত্রী মহুয়া রউফ, ‘বৃক্ষবন্ধু’ আজহারুল ইসলাম খান, পিটাছড়া বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল প্রমুখ। নিয়মিত অতিথি ও ভ্রমণবিষয়ক লেখক হিসেবে আমিও নিমন্ত্রণ পেয়েছি। তবে সত্যি বলতে কি, শ্রীমঙ্গলে আসার সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিল বৃষ্টি। বর্ষার শ্রীমঙ্গলের ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য কার!

.

কিন্তু ২৬ জুন শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে নেমে বেশ হতাশই হয়েছিলাম। দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায়ও এমন তাপপ্রবাহ! গরম মেনে নেওয়া গেলেও মন মানছিল না। কখন আসবে বৃষ্টি, কখন আসবে বৃষ্টি—তখন থেকেই অপেক্ষা। মাঝেমধ্যে দু-একপশলা হয়েছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ঝুম বর্ষণের দেখা মেলেনি।

অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান।

ছাতা হাতে দোতলার কাঠের ঘর থেকে নামতে গিয়ে আবারও একটু কৌশল করতে হলো। সিঁড়িটা একটি কুকুরের প্রিয় আস্তানা। তাকে বিরক্ত না করেই পাশ কাটিয়ে নামতে হয়। নিচেই পুকুর। ততক্ষণে বৃষ্টির গতি বেড়েছে। টিনের ছাদে শুরু হয়েছে বৃষ্টির বাদ্য। পুকুরের পানিতেও অনবরত ফোঁটার নাচ।

পুকুরপাড়জুড়ে নানা জাতের ফুলের গাছ। কোথাও ফুল ফুটেছে, কোথাও আসছে ঋতুর অপেক্ষা। পাহাড়ঘেঁষা পাড়ের এক কোণে পানির ওপর কাঠের একটি মাচা। দেখতে অনেকটা সমুদ্রসৈকতের চেয়ারের মতো। সেখানে বসে ছাতার আশ্রয়ে থেকে কিছুক্ষণ বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির ছবি তুললাম। একসময় মুঠোফোন আর ছাতা—দুটোকেই বিদায় জানিয়ে নিজেকে সঁপে দিলাম বৃষ্টির কাছে।

নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় মাটির সোঁদা গন্ধ নেই। কাদা কাদা হয়ে আছে মাটি। তাই ঘাসের ওপর দাঁড়াই। গাছপালা থেকে ফাঁকামতো জায়গায় দাঁড়িয়ে মুখ তুলে, চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির ছোঁয়া নিই। পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসছে জলধারা, দূরের ঝিরিতে স্পষ্ট শোনা যায় পানির স্রোতের শব্দ। মাঝেমধ্যে আদুরে সুরে ডেকে ওঠে মেঘ।

.

একসময় বৃষ্টির গতি কমে আসে। ভেজা শরীরে কাঠের ঘরের বারন্দায় গিয়ে দাঁড়াই। চারপাশের গাছ বেয়ে পানি ঝরছে। একটি কাঠবিড়ালি দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিল টিনের চালের নিচে। শান্তিবাড়ি অতিথিদের প্রকৃতির আরও কাছে নিয়ে যায় বলেই সাত বছর আগে যুক্তরাজ্যের দ্য ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে এক প্রতিবেদনে এই রিসোর্টের ব্যতিক্রমী দর্শনের কথা উল্লেখ করেছিল। এখানকার কোনো কক্ষে টেলিভিশন নেই। প্রতিষ্ঠার অনেক পরে অতিথিদের প্রয়োজন বিবেচনায় কয়েকটি কক্ষে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র যুক্ত হলেও প্রকৃতির সান্নিধ্যই এখনো এই রিসোর্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

প্রতিষ্ঠাতা তানভীর আরেফিন লিংকন বলেছিলেন, ‘আমরা চাই, এখানে এসে কেউ যেন রুমে আটকে না পড়েন। অতিথিরা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাক, গাছের ছায়ায় বসুক, চাঁদের আলোয় ভাসুক।’

বৃষ্টিভেজা দুপুরে টিনের চালে ঝরে পড়া ফোঁটার শব্দ শুনতে শুনতে মনে হলো, তাঁর সেই স্বপ্ন এখনো এই কাঠের দোতলা ঘরে বেঁচে আছে। হয়তো এ কারণেই শ্রীমঙ্গলে এলেই এই কাঠের ঘর বারবার আমাকে টানে।

.ছুটির দিনে ঘুরে আসুন পুরান ঢাকার এই ১০ ঐতিহাসিক স্থান থেকে