উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে আমরা সাধারণত সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকি। সেটিই স্বাভাবিক। কারণ, নাগরিকের অধিকার ও চাহিদা পূরণ করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রের নানা সংকট, সীমাবদ্ধতা, অক্ষমতা, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকেরাই এগিয়ে আসেন নিজেদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে। যেমনটি দেখালেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নের সিংগুর গ্রামের তরুণেরা।
মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সিংগুর গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের যাতায়াতের প্রধান দুটি রাস্তা দীর্ঘ ১০-১৫ বছর আগে ইটের সলিং করা হলেও সংস্কারের অভাবে তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই রাস্তাগুলো দিয়ে চলাচল করা ছিল চরম দুর্ভোগের। এ অবস্থায় গ্রামের তরুণদের সংগঠন ‘পূর্ব সিংগুর নতুন কুঁড়ি ক্লাব’ প্রবাসী ও স্থানীয় সচ্ছল ব্যক্তিদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে দুটি আমূল পরিবর্তন করে ফেলে।
সিংগুর গ্রামের এই তরুণদের সামাজিক কাজের পরিধি কেবল এই রাস্তা সংস্কারেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে হাকালুকি হাওরের কৃষকদের রোদ, বৃষ্টি ও বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দিতে তাঁদের নির্মিত ‘কৃষক ছাউনি’ দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। এ ছাড়া গ্রামে নিজস্ব উদ্যোগে ৫০টি সড়কবাতি স্থাপন ও পানিনিষ্কাশনের ড্রেন পরিষ্কারের কাজও তাঁরা নিয়মিত করছেন। রাষ্ট্রের প্রতিটি কোনায় যখন ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতির খবর আমাদের আশাহত করে, তখন কুলাউড়ার এই যুবকদের নিঃস্বার্থ সমাজসেবা আমাদের নতুন করে আশার আলো দেখায়।
তবে নাগরিক উদ্যোগ একটি সাময়িক উপশম বা প্রাথমিক প্রতিরোধ মাত্র; রাষ্ট্রের স্থায়ী পরিকাঠামো উন্নয়নের মূল দায়িত্ব সরকারেরই। বোরো মৌসুমে হাকালুকি হাওরে কৃষকদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এই রাস্তা দুটির স্থায়িত্ব রক্ষা করা জরুরি। বনের পানির স্রোত ও অতিবৃষ্টির হাত থেকে রাস্তা দুটি বাঁচাতে হলে সেখানে দুটি কালভার্ট ও প্রতিরক্ষা দেয়াল (গাইড ওয়াল) নির্মাণ করা প্রয়োজন, যা এই তরুণদের পক্ষে এককভাবে সম্ভব নয়। কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এই উদ্যোগের প্রশংসা করে যে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন, আমরা তার দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই। উপজেলা প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে সিংগুর গ্রামে গিয়ে রাস্তাটির পানিনিষ্কাশন ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে সরকারি প্রকল্প গ্রহণ করা। তরুণেরা যে পথ দেখিয়েছেন, সরকার যেন সেখানে টেকসই উন্নয়নের ছোঁয়া দিয়ে তাঁদের এই উদ্যমকে আরও বেগবান করে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সিংগুর গ্রামের যুবকদের জানাই আন্তরিক অভিবাদন।






