আমি একজন মিথ্যুক। অধিকাংশ সময় মিথ্যা কথা বলি। সব সময় বলা সম্ভব হলে বলতাম। সেটা সম্ভব না। তবে চেষ্টা করি। যতটা পারি।

বিলকিস আপার বাসায় গিয়েছিলাম। মোকারম ভাই পা ভেঙে শয্যাশায়ী হয়ে আছেন। বিলকিস আপা ও মোকারম ভাইয়ের মেয়ে মুসকান ও লেভেল পরীক্ষা দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। সে মোকারম ভাইয়ের দুর্দশা নিয়ে ফানি ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে ছেড়েছে। ৮ ঘণ্টায় ৬৪ হাজার ভিউ হয়েছে। ৬৪০ জন শেয়ার দিয়েছে। মোকারম ভাই দুঃখজর্জর হয়ে আছেন। বিচলিত হয়ে আছেন।

‘বাপেরে নিয়া ভিউ ব্যবসা করে মেয়ে! এই মেয়েরে আমি পেটে ধরছিলাম!’

‘মোকারম ভাই!’

কী পরিমাণ বিচলিত হয়েছেন মানুষটা! মাথা আউলাঝাউলা হয়ে গেছে। বিলকিস আপা অসহায়ভাবে বলল, ‘দেখলি তো? শুনলি তো? বুঝলি তো অবস্থা!’

দেখলাম, শুনলাম, বুঝলাম। মোকারম ভাইকে সান্ত্বনা দিলাম, ‘এতটা ভেঙে পড়বেন না, মোকারম ভাই। অ্যানজেলা ফুফুর দশা আপনার হয় নাই। ঢাকা শহরে বন নাই, বন থাকলে বনে পশু–পক্ষী থাকত, অ্যানজেলা ফুফুর দুর্দশায় সেই পশুকুল, পক্ষীকুল কাঁদত; আমি শিওর। আহারে জীবন! আহারে নাকফুল! আহারে গোল্ড!’

বিলকিস আপা বলল, ‘অ্যানজেলা ফুফুর আবার কী হইছে?’

‘কেন? তোমরা খবর পাও নাই?’

‘কী খবর? আমি আছি এই লুলারে নিয়া আর আমার ঢঙ্গী কইন্যারে নিয়া। খবরে আছি?’

‘অ্যানজেলা ফুফু হসপিটালাইজড ছিলেন, এইটা তো জানো?’

‘না রে ভাই, আমি কিছুই জানি না।’

‘লাইফ সাপোর্টে ছিলেন ছয় দিন। কাল রাতে লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া হইছে।’

‘কী বলিস? অ্যানজেলা ফুফু আর নাই! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! তারা কি কবর দিয়া দিছে ফুফুরে?’

দূরসম্পর্কের ফুফু, তার মৃত্যুতে সেই মাত্রার শোক হলো না বিলকিস আপার। মোকারম ভাই বললেন, ‘ভালো মানুষেরা আগে চলে যায়। আমিও দেখবা আগে চলে যাব।’

বিলকিস আপা বলল, ‘তুমি ভালো মানুষ!’

আমি বললাম, ‘আগে তো শোনো। অ্যানজেলা ফুফুর কবর এখনো হয় নাই। তার দুই নাতনি, সানজানার দুই মেয়ে সায়রা, সামিরা, গোল্ডেন নাকফুল ধরে টানাটানি করে মরা দাদির নাক ছিঁড়ে নিছে। সেই ঘটনা ভিডিও করে আবার ফেসবুক, ইউটিউবে দিছে।’

‘এ কী জমানা আইলো রে ভাই?’

বিলকিস আপার বাসা থেকে খেয়ে ফিরেছি। মুসকানের সঙ্গে দেখা হয় নাই। ভালো হয়েছে। মুসকান সম্ভবত জন্মের পর থেকেই আমার কোনো কথা বিশ্বাস করে না। বুদ্ধিমতী হাইপেশিয়া!

উনিশ বছর বয়সে অ্যানজেলা ফুফুর বিয়ে হয়েছিল খলকু ফুফার সঙ্গে। ব্যারিস্টার খলিকুজ্জামান খলকু। তাদের এক পুত্র, এক কন্যা। জাভির ভাই আমার বড়, সানজানা ছোট। জাভির ভাই সাইপ্রাসে থাকে, রাশিয়ান মেয়ে বিয়ে করেছে। সানজানা ছাত্রী থাকা অবস্থায় ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপককে বিয়ে করেছে। দুইটা ডিম পেড়েছিল। সেই দুইটা ডিম বড় হয়ে গেছে: সায়রা, সামিরা।

বাসায় ফিরে বে-কে কল দিলাম। বেনজির সংক্ষেপে বে। বে-র ওয়াইফ জাকিয়া কল ধরল, ‘আপনার বন্ধু তো বাসায় নাই। আমার সাথে ঝগড়া করে ফোন রেখে বের হয়ে গেছে।’

‘এই কারণেই তোমারে কল দিলাম। সে এখন কই আছে, সেইটা তোমারে বলা উচিত হবে না। তবে সুস্থ আছে, নিরাপদে আছে। টেনশন কোরো না।’

.
‘সে বনলতা সেনের ভাইপো।’

‘তুমি সব বিশ্বাস করো অতনু। যে যা বলে, বিশ্বাস করো।’

‘অবিশ্বাস করার মতো কিছু নাই।’

‘কিছুই নাই? তুমি বিশ্বাস করো, বিজন সেন বনলতা সেনের ভাইপো? বিশ্বাস করো? তাতে কী, অতনু? বনলতা সেনের ভাইপো হিসেবে নিশ্চয়ই তারে বিয়া করে নাই নিশুতি?’

‘কে জানে কী? তবে বিজন সেনের অঢেল টাকা।’

.

‘টেনশন করি না। সুস্থ, নিরাপদে সে কোন চুলায় আছে, বলেন?’

‘সন্ধ্যায় কাঁটাবন কনকর্ড টাওয়ারের আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেটে ছিল। যথাপ্রকাশের শো রুমে তার সাথে কবি সুলতানা রুবির দেখা হইছে। রুবি আমাদের বন্ধু, তুমি জানো।’

‘চুপ করেন! আপনাদের বন্ধু ওই হারামজাদির ফোন নাম্বার দেন।’

‘মাথা গরম কোরো না, জাকিয়া। ওয়ান নাইট স্ট্যান্ডের ব্যাপার, বুঝছো না! কাল সকালে দেখবা লক্ষ্মী ছেলের মতো বাসায় ফিরে আসবে বেনজির। রুবির নাম্বার তো বেনজিরের ফোনে থাকার কথা। তবু আমি ফরোয়ার্ড করে দিতেছি। তুমি স্ট্রেস নিয়ো না, বুঝছ?’

‘বুঝছি! রাখেন!’

জাকিয়াকে রুবিনার নাম্বার ফরোয়ার্ড করে দিলাম। ওম শান্তি!

এখন একটা সিগারেট টানা যায়। বেনসন অ্যান্ড হেজেস টানতাম, ব্যয় সংকুলান করতে গোল্ড লিফ ধরেছিলাম, গোল্ড লিফ ছেড়ে লাকি স্ট্রাইক ধরেছি। লাকি। স্ট্রাইক। একটা ধরালাম। দরজায় টোকা দিল কেউ।

আমার বাসায় কলবেল নাই, পরিচিতরা অবগত।

দরজা খুলে দেখলাম, কেউ নাই। মনের ভুল তবে। ঘরে ঢুকে দরজা লক করেছি, আবার টোকা। স্পষ্ট। এবার দরজা খুলে দেখলাম অতনু। অতনু আমার কাছে আসে, এটা বললে আমার কথা কেউ বিশ্বাস করে না। শিমা বিশ্বাস করেছেন হয়তো। কিন্তু ভিডিও কল দিয়ে তাকে আমি কিছু প্রমাণ দেখাতে পারব না। মোবাইল ফোনে ইমেজ ধরে না অতনুর। অতনু সে। তনু নাই আর। শরীর নাই। মরে গেছে দশ বছর আগে। পোস্তগোলা শ্মশানে তাকে দাহ করা হয়েছিল।

ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে অতনু বলল, ‘আনন্দে আছ?’

‘তা আছি। টানবা?’

‘দুই টান দেই।’

লাকি স্ট্রাইকে দুই টান দিল অতনু। গাঁজারু ছিল। ব্যোম ভোলানাথ বলে টান দিত কল্কিতে। ‘নদের চাঁদ ও অন্তঃপুরবাসিনী’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিল। কল্কে পায় নাই। অসন্তুষ্ট হয় নাই তাতে। হরতন–রুহিতনরা একটা লিটল ম্যাগ করত—ইস্কাপন। সাড়ে তিন সংখ্যা বার হয় নাই, ‘বাংলা সাহিত্যে ইস্কাপন যুগ’ একটা ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করে ফেলা হয়েছে। অতনুর বই নিয়ে একটা হিংসাপরায়ণ আলোচনা ছেপেছিল ইস্কাপন। অতনুকে কবি হিসেবে সিসার গুঁড়া বানিয়ে তারা ঢাকার বিপজ্জনক আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিল। বোঝার উপর শাকের আঁটি।

‘মৃতরা মিথ্যা কথা বলে না, অতনু?’

‘আমি কি মৃত?’

‘তুমি মরো নাই?’

‘আমরা এখন তেরো বছর আগের একটা রাতে আছি।’

‘অ।’

তেরো বছর আগে মরে নাই অতনু। যখন আসে, সব সময় এ রকম বলে—আঠারো বছর আগের দুপুরে আছে, একুশ বছর আগের সন্ধ্যায় আছে। সেই সব দুপুর ও সন্ধ্যার মায়া ও আভা ফুটে ওঠে তার অবয়বে আর কোনো জগতের জিনিস সে না, অতীব পার্থিব।

‘নিশুতি বিয়া করছে, তুমি শুনছ?’ অতনু বলল।

‘না। কারে?’

‘বিজন সেনরে।’

‘বিজন সেন? বনলতা সেনের দূরসম্পর্কের ভাইপো দাবি করে যে নিজেরে?’

‘হতে পারে।’

‘কী?’

‘সে বনলতা সেনের ভাইপো।’

‘তুমি সব বিশ্বাস করো অতনু। যে যা বলে, বিশ্বাস করো।’

‘অবিশ্বাস করার মতো কিছু নাই।’

‘কিছুই নাই? তুমি বিশ্বাস করো, বিজন সেন বনলতা সেনের ভাইপো? বিশ্বাস করো? তাতে কী, অতনু? বনলতা সেনের ভাইপো হিসেবে নিশ্চয়ই তারে বিয়া করে নাই নিশুতি?’

‘কে জানে কী? তবে বিজন সেনের অঢেল টাকা।’

.
‘জাকিয়া? ‘হ্যাঁ জাকিয়া, বেনজির—এরা কারা? তোরে চিনে। তুই জাকিয়ারে আমার ফোন নাম্বার দিছিস।’ ‘আমি! জাকিয়া নামটা আমি শুনি নাই তা না, কিন্তু কোনো জাকিয়ার সাথে আমার পরিচয় হয় নাই বা কখনো দেখা হয় নাই। এক বেনজির আছে বন্ধু। আমরা তারে ডাকি বুলডোজার বেনজির। বেনজিরও ফোন দিছিল নাকি তোরে? ঘটনা কী রে?’
.

‘দুই জাহাজ?’

‘কী?’

‘বিজন সেনের টাকার পরিমাণ কত? দুই ট্রাক না দুই জাহাজ?’

‘সাবমেরিন। দুই সাবমেরিনভর্তি টাকা লোকটার।’

‘তুমি একটা হারামি, অতনু। সমূহ হারামি, ব্যাপক হারামি, প্রচুর হারামি। এই যে তুমি হাসছ, তোমাকে শিশু মনে হচ্ছে, তুমি ঠিক যেন এতটা বিভ্রম।’

মোবাইল ফোন বাজল। অ্যাংফু কলিং। খাইসে আমারে! কল রিসিভ করলাম, ‘স্লামালিকুম, ফুফু।’

‘ওয়ালিকুম সালাম। এই কমিন! কমিনের ঘরের কমিন, আমি কুনবেলা মরলাম রে?’

উনিশ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে একচল্লিশ বছর ধরে ঢাকায় আছেন, অ্যানজেলা ফুফু ঢাকার কমন খাইছি-গেছি ভাষা রপ্ত করতে পারেন নাই। খাইমু, যাইমু, উবা কিতারে বলেন। আমাদের ভাষা। অ্যানজেলা ফুফুর সঙ্গে যখন কথা বলি, আমিও খাইমু, যাইমু, উবা কিতারে বলি।

বললাম, ‘তুমি মরি গেছ! ইতা কিতা কও? এই কতা তুমারে কে কইল?’

‘কে কইল? তুই বিলকিসরে কিতা কইছস রে, কমিন? আমি কুন দিন লাইফ সাপোর্টো আছলাম?’

‘ইতা কিতা কও? বিলকিস আফারে আমি কইছি তুমি লাইফ সাপোর্টো আছ? কুন দিন কইছি? ইটা কী রকম কতা, বুঝলাম না। ছি ছি ছি! ছিহ্! তুমি লাইফ সাপোর্টো কেনে থাকতায়?’

‘বিলকিসরে ই কতা কইছস না তুই?’

‘কেনে কইতাম? কুন দিন কইতাম কও? আট দিন আমি আছলাম বরিশাল। জাহাজে গেছলাম। আইজ মাত্র হাইনজাবেলা ফিরছি। বিলকিস আফার লগে আমার দেখা অইল কই? না আমি ফোন দিয়া তাইরে কইছি?’

‘বরিশাল আছলে? আজকে বিলকিসের বাসাত গেছলে না তুই?’

‘বরিশালের কসম গো ফুফু! মুসকানের লগে মাত অইছেনি তুমার? তাইরে জিগাও দেখি, আমি তারার বাসাত গেছি কি না। বিলকিস আফার মাথাত দোষ, তুমারে কইছে, তুমি মরি গেছ! কত বড় মাথাত দোষ বুঝছ? তুমি অখন মরতায় কেনে? তুমার মরার বয়স অইছেনি? তুমি এক শ দশ বছর বাঁচতায়।’

আরও কিছু মিথ্যা কথা বলে অ্যানজেলা ফুফুর বিক্ষুব্ধ মনকে সান্ত্বনা ও প্রবোধ দিতে পারলাম। আমাদের অনিলের মেজ বোন সান্ত্বনা। সান্ত্বনার বিয়ে টাউনের প্রবোধের সঙ্গে হয়েছে।

‘তোমার অ্যানজেলা ফুফুর মেয়ে সানাজানারে আমি দেখছি। তোমার কি মনে হয় নাই সানজানা অলিভিয়ার মতো দেখতে? সিনেমার নায়িকা।’ অতনু বলল।

আর কেউ হলে, আমি কী বলতাম? ‘অলিভিয়ার মতো মানে? সিনেমার নায়িকা মানে? সানজানা তো সিনেমার নায়িকাই...।’

কিন্তু এ হলো অতনু। মরে গেছে দশ বছর আগে। বললাম, ‘বিলকিস আপা অ্যানজেলা ফুফুরে কল দিতে পারে, চিন্তা করি নাই।’

অতনু হাসল, সেই আভা ও মায়া তার চোখে–মুখে ফুটল। আমি আরেক শলা সিগারেট ধরালাম। রুবিনা কল দিল, ‘জাকিয়া কে রে?’

‘জাকিয়া?

‘হ্যাঁ জাকিয়া, বেনজির—এরা কারা? তোরে চিনে। তুই জাকিয়ারে আমার ফোন নাম্বার দিছিস।’

‘আমি! জাকিয়া নামটা আমি শুনি নাই তা না, কিন্তু কোনো জাকিয়ার সাথে আমার পরিচয় হয় নাই বা কখনো দেখা হয় নাই। এক বেনজির আছে বন্ধু। আমরা তারে ডাকি বুলডোজার বেনজির। বেনজিরও ফোন দিছিল নাকি তোরে? ঘটনা কী রে?’

.
‘রাখেন আপনার আনাজপাতি। আপনার বন্ধুর সাথে কথা বলেন।’ বে ফোন নিয়ে বলল, ‘হারামজাদা!’ পপাই দ্য সেইলরের মতো হাসলাম। আর কী করব? আমি অধিকাংশ সময় মিথ্যা কথা বলি। মোবাইল ফোনে নাইনটি নাইন পার্সেন্ট বলি। মোবাইল ফোন অফ করে দিলাম। এখন আমি আর অতনু কথা বলব। সারা রাত কথা বলব। দশ বছর আগে মরে গেছে অতনু, তার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলা যায় না।
.

‘ঘটনা কী, তুই জানিস। তোর বন্ধু বেনজিরের ওয়াইফ জাকিয়া। আমারে কল দিয়া বলতেছে, আমি রুবি! আমি যত বলি আমি রুবিনা, শুনেই না। মহিলা শিওর, আমি রুবি এবং তার জামাইরে নিয়া আমি ওয়ান স্ট্যান্ডের প্রস্তুতি নিতেছি। তুই এই কথা তারে বলছিস।’

‘আমি! তোর এই জাকিয়ারে আমি চিনি না, কসম! বুলডোজার বেনজিরের বউ তো তাসনুভা; পিএইচডি করতে গেছে কামস্কাটকায়। পত্নীশোকে বুলডোজার বর্তমানে রিহ্যাবে আছে। আগে আরও কয়েকবার ছিল।’

‘বদমায়েশ!’

‘তা ঠিক, বুলডোজার পাকা বদমায়েশ। বাংলা গল্প-উপন্যাস-নাটক-সিনেমায় এখন পর্যন্ত তার চরিত্র চিত্রিত হয় নাই। তার চরিত্র করার মতো অভিনেতা নাই।’

‘তুই অভিনয় কর বদমায়েশ!’ বলে রুবিনা লাইন কেটে দিল।

রুবিনা আমার আরেক ফুফুর ঘরের বোন। আমার দুই মাস পরে এই ধরায় ভূমিষ্ট হয়েছে। শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছে। রুবিনার ছেলে আফরান আমার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে। শিক্ষানবিশ পর্যায়ে আছে; ব্রাইট ফিউচার। আফরান পক্ষীবিশারদ। দল বেঁধে তারা পাখি দেখতে যায়। চার-ছয়টা পাখির ছবি দেখিয়েছে মাকে। সে তুলেছে, রুবিনা তাতে ভীষণই সন্তষ্ট। ছেলে আপথে-কুপথে যায় নাই।

কচু! পাখি দেখার নাম করে আফরান নাহরিনের সঙ্গে নিরজনে থাকে। তা নাহরিনও পাখি বটে।

‘আজ আমার আসা ঠিক হয় নাই।’ অতনু বলল।

‘কেন? অঠিক মনে হইতেছে কেন তোমার?’

‘তুমি ব্যস্ত।’

‘ব্যস্ত। হা হা হা। ব্যস্ততা আমাকে দেয় না অবসর?’

বাধা পড়ল। মোবাইল ফোন বাজল। বে কলিং। কল ধরতেই ফায়ার ব্রিগেডের পাগলা ঘণ্টির মতো খেই খেই করে বেজে উঠল জাকিয়া, ‘আপনি কি মানুষ? ছিহ্? এই রকম মিথ্যা কথা বলেন!’

‘বেনজির বাসায় ফিরছে?’

‘ফিরবে কেন? আপনি না বললেন, আপনার বন্ধু ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড করতে গেছে?’

‘আমি বললাম?’

‘বলেন নাই? আপনার বন্ধু রুবির বাসায় গেছে বলেন নাই? ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড করবে বলেন নাই?’

‘রুবি! আমি তোমারে রুবির কথা বলছি? রুবি কে?’

‘দেখো অবস্থা! সন্ধ্যায় আমি আপনেরে ফোন দেই নাই?’

‘সন্ধ্যায় ঠিক কখন বলো তো?’

‘আপনার মোবাইল ফোনে দেখেন কখন।’

‘সন্ধ্যায় আমি সিনেপ্লেক্সে ছিলাম, জাকিয়া। “মাইকেল” দেখতে গেছিলাম। যতক্ষণ সিনেমা দেখছি, আমার মোবাইল ফোন অফ ছিল, কসম। আমার এই কথা যদি তোমার বিশ্বাস না হয়, সিনেপ্লেক্সের সিইও আনাস শরাফের ফোন নাম্বার দেই, কথা বলো তুমি। সত্যবাদী আনাস শরাফ।’

‘রাখেন আপনার আনাজপাতি। আপনার বন্ধুর সাথে কথা বলেন।’

বে ফোন নিয়ে বলল, ‘হারামজাদা!’

পপাই দ্য সেইলরের মতো হাসলাম। আর কী করব? আমি অধিকাংশ সময় মিথ্যা কথা বলি। মোবাইল ফোনে নাইনটি নাইন পার্সেন্ট বলি।

মোবাইল ফোন অফ করে দিলাম। এখন আমি আর অতনু কথা বলব। সারা রাত কথা বলব। দশ বছর আগে মরে গেছে অতনু, তার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলা যায় না।