• নিহতদের মধ্যে ২১ হাজার ৫০০টির বেশি শিশু, ১ হাজার ২২ শিশু জন্মের পরই নিহত।

  • যুদ্ধ চলাকালে গাজার ওপর প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার টন বিস্ফোরক ফেলেছে ইসরায়েল।

  • গাজার প্রায় ৪ লাখ মানুষ দিনে মাত্র একবার খাবার খেতে পারছেন।

  • যুদ্ধে গাজাজুড়ে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ জমেছে।

.

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের ১ হাজার দিন পূর্ণ হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। এ সময়ে উপত্যকাটির ৯০ শতাংশের বেশি এলাকা ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েল। প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা এখন যুদ্ধবাজ এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। প্রাণ হারিয়েছেন ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের উদ্যোগও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস থেকে গতকাল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৬৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২১ হাজার ৫০০টির বেশি শিশু, যার মধ্যে ১ হাজার ২২টি শিশু জন্মের পরপরই মারা গেছে। এ ছাড়া ৯ হাজার ৫০০ জন এখনো নিখোঁজ, যাঁদের অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে গাজার ওপর প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার টন বিস্ফোরক ফেলেছে ইসরায়েল। তাদের দাবি, ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্র যে পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল, গাজায় তার চেয়ে প্রায় ১৬ গুণ বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে ইসরায়েল।

.

যুদ্ধবিরতির উদ্যোগে অচলাবস্থা

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অনুমোদিত তিন ধাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং যুদ্ধবিরতি তদারকির জন্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করা হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এই কাঠামো কার্যকর হতে পারেনি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে ইসরায়েলি বাহিনীর সরে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে গাজায় তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়েছে। প্রতিদিন যত ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের কথা ছিল, তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ গাজায় ঢুকতে পারছে। গত বছরের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে সেখানে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

বিশ্লেষক ইয়াদ জুদা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বোর্ড অব পিস’ তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে। গাজা ও পশ্চিম তীরকে একীভূত করার যে লক্ষ্য ছিল, সেটিও এগোচ্ছে না। এ ছাড়া প্রতিশ্রুত কয়েক শ কোটি ডলারের অর্থ এখনো না আসায় পুনর্গঠন কার্যক্রমও শুরু করা যাচ্ছে না।

.

দুর্ভিক্ষ ও ধ্বংসস্তূপ

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় সব বাসিন্দা এখন দুর্ভিক্ষের চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রায় চার লাখ মানুষ দিনে মাত্র একবার খাবার পাচ্ছেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ৬২ শতাংশ ওষুধের মজুত শেষ হয়ে গেছে। সংস্থাটি বলছে, এই যুদ্ধ গাজার মানব উন্নয়নকে অন্তত ৭৭ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। সেখানে গড় আয়ু নেমে এসেছে ৪০ বছরে।

যুদ্ধে গাজাজুড়ে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ জমেছে। জাতিসংঘের হিসাবমতে, এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সরানো গেছে মাত্র ৩ লাখ ১০ হাজার টন, যা মোট ধ্বংসস্তূপের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের কম। বর্তমান গতিতে সব ধ্বংসস্তূপ সরাতে ১৪০ বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।

গাজা সিটির মেয়র ইয়াহইয়া আল-সাররাজ আল-জাজিরাকে বলেন, শহরের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ও সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পৌর কর্তৃপক্ষ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। তবে সীমান্ত খুলে দিলে মানুষ নিজেরাই ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ শুরু করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

.

সমঝোতায় অচলাবস্থা

যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনায় অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। পুনর্গঠন শুরুর আগে হামাসকে নিরস্ত্র করার দাবি জানিয়েছে ইসরায়েল। তবে আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলা সাবেক বন্দী নাসের ফারাম বলেন, ‘আগে দখলদারত্বের অবসান হোক, তারপর অস্ত্রের বিষয়টি আলোচনা করা যেতে পারে।’

আর গাজার বাসিন্দা হাসান শরাফের মতে, অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ একটি বৈধ শাসনব্যবস্থার হাতে থাকা উচিত।

গত সোমবার ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় সদেরোত শহরের মেয়র আলোন দাভিদির সঙ্গে বৈঠকের পর ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেন, গাজার বাকি অংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে, হামাসকে পরাজিত করতে হবে এবং সীমান্তজুড়ে ইহুদি বসতি গড়ে তুলতে হবে। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘যেখানে বসতি নেই, সেখানে নিরাপত্তাও নেই। ৭ অক্টোবরের আগের পরিস্থিতিতে আমরা আর ফিরব না।’

.

ইসরায়েলেও বিক্ষোভ

যুদ্ধের এক হাজার দিন উপলক্ষে আজ ইসরায়েলেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও মুক্তিপ্রাপ্ত জিম্মিদের সংগঠন অক্টোবর কাউন্সিলের উদ্যোগে বিক্ষোভ ও পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।

বিক্ষোভকারীদের ‘১,০০০ দিনের পরিত্যাগ, অবহেলা, গোপনীয়তা ও ব্যর্থতা’ লেখা ব্যানার বহন করতে দেখা যায়। একই সঙ্গে হামলার সময় নিরাপত্তা–ব্যর্থতার স্বাধীন তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তাঁরা। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবন নেসেটে প্রবেশের পথ অবরোধেরও চেষ্টা করেন।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার সীমান্তসংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে প্রায় পাঁচ হাজার ইসরায়েলি বসতি স্থাপন করেছেন। যুদ্ধের আগে সেখানে প্রায় ৬২ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। হামলার পর অনেকে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশ ফিরে এসেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের জনসংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর ইসরায়েল সরকার।