কে এই ইলন মাস্ক এবং কী তার বৈশিষ্ট্য? কেন তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন? কী এমন শক্তি বা চিন্তাধারা কাজ করেছে তার সাফল্যের পেছনে? কীভাবে একজন মানুষ এত বিপুল সম্পদ অর্জন করতে পারেন? এটি কি জাদু নাকি দীর্ঘ পরিকল্পনা, ঝুঁকি গ্রহণ, ব্যর্থতা এবং অধ্যবসায়ের বাস্তব ফল?

আজ পৃথিবীর বহু মানুষ ইলন মাস্ককে দেখে বিস্মিত হয়। কেউ তাঁকে উদ্ভাবক বলেন, কেউ ব্যবসায়িক প্রতিভা, কেউ আবার বিতর্কিত এক ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কিন্তু তাঁর গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। তিনি শুধু অর্থ উপার্জন করেননি, তিনি এমন সব সমস্যাকে লক্ষ্য করেছেন, যেগুলোকে অধিকাংশ মানুষ অসম্ভব বলে মনে করেছিল।

অনেকেই ভাবেন, ইলন মাস্কের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর অর্থ। কিন্তু বাস্তবে তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ সম্ভবত তাঁর চিন্তার ধরন। তিনি এমন প্রশ্ন করেন, যা অন্যরা করতে সাহস পায় না। তিনি এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, যা শুনতে অবাস্তব মনে হয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বেসরকারি মহাকাশ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং মানবসভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কাজ করেছেন এমন সময়ে, যখন অনেকেই এগুলোকে কল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।

.

কিন্তু এখানেই একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে।

যদি পৃথিবীতে এত সম্পদ সৃষ্টি হয়ে থাকে, যদি প্রযুক্তি এত উন্নত হয়ে থাকে, যদি একজন ব্যক্তি শত শত বিলিয়ন ডলারের মালিক হতে পারেন, তাহলে একই পৃথিবীতে কেন কোটি কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে? কেন খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ জীবনের মৌলিক সুযোগ থেকে এত মানুষ বঞ্চিত?

এখানেই ইলন মাস্কের অস্তিত্ব একটি বৃহত্তর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি প্রতীক। তাঁর সাফল্য দেখায় মানুষ কত দূর যেতে পারে। আবার একই সঙ্গে পৃথিবীর বৈষম্যও দেখায়, সবাই সেই সুযোগ পায় না।

সম্ভবত ইলন মাস্ক আমাদের একটি নীরব বার্তা দিচ্ছেন।

পৃথিবীতে সম্পদের অভাব নেই। অভাব হলো সুযোগের ন্যায্য বণ্টনের। অভাব হলো এমন শিক্ষাব্যবস্থার, যা কৌতূহলকে উৎসাহিত করে। অভাব হলো এমন রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর, যা মানুষের সম্ভাবনাকে বিকশিত হতে দেয়।

.

আরও একটি বিষয় আছে, যা অনেকেই আলোচনা করেন না।

ইলন মাস্কের মতো মানুষেরা জন্মের পর থেকেই পৃথিবী যেমন আছে, তেমনভাবে মেনে নেন না। তাঁরা পৃথিবীকে প্রশ্ন করেন। তাঁরা বিদ্যমান বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁরা ব্যর্থতাকে শেষ বলে মনে করেন না। তাঁদের অনেক সিদ্ধান্ত ভুল হয়, অনেক প্রকল্প ব্যর্থ হয়, অনেক সমালোচনা তাঁদের ঘিরে থাকে। কিন্তু তাঁরা থেমে যান না।

এই কারণেই হয়তো পৃথিবীতে লাখ লাখ মানুষ ইলন মাস্ক হতে চায়, কিন্তু খুব কম মানুষ তাঁর মতো চিন্তা করার চেষ্টা করে।

হয়তো সত্যিকারের প্রশ্নটি হলো না, কীভাবে ইলন মাস্ক হওয়া যায়।

বরং প্রশ্নটি হতে পারে কীভাবে নিজের ভেতরে থাকা সম্ভাবনাকে এমনভাবে বিকশিত করা যায়, যাতে আমরা আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর সমাধানে অবদান রাখতে পারি?

কারণ পৃথিবীর আরেকজন ইলন মাস্ক হয়তো প্রয়োজন নেই।

পৃথিবীর প্রয়োজন এমন কোটি কোটি মানুষ, যারা নিজেদের সীমাবদ্ধতার বাইরে চিন্তা করতে শিখবে, প্রশ্ন করতে শিখবে, ব্যর্থতাকে ভয় পাবে না এবং নিজের সাফল্যের সঙ্গে মানবতার ভবিষ্যৎকেও যুক্ত করতে পারবে।

.
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com
.

সেখানেই হয়তো ইলন মাস্কের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লুকিয়ে আছে। তিনি শুধু দেখাননি একজন মানুষ কত ধনী হতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন, একজন মানুষের ধারণা কত দূর পর্যন্ত পৃথিবীকে প্রভাবিত করতে পারে।

একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন করা যেতে পারে। যদি ইলন মাস্কের সম্পূর্ণ সম্পদ পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হতো, তাহলে প্রত্যেকে আনুমানিক এক শ ডলারের কিছু বেশি পেত। অর্থাৎ একজন মানুষের কল্পনাতীত সম্পদও পৃথিবীর সমগ্র জনসংখ্যার মধ্যে ভাগ করে দিলে তা প্রত্যেকের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনার মতো বিশাল অঙ্কে পরিণত হয় না।

কিন্তু এখানেই একটি গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। পৃথিবীর সমস্যা কি শুধু সম্পদের অভাব নাকি সুযোগের অভাব?

কারণ মানবসভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান শুধু সম্পদ পুনর্বণ্টনে নয় বরং এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলার মধ্যে নিহিত, যেখানে আরও বেশি মানুষ নিজেদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার সুযোগ পায়।

কিন্তু ইলন মাস্কের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হয়তো তাঁর সম্পদের পরিমাণ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো পৃথিবীতে কতজন ইলন মাস্ক জন্ম নেওয়ার সুযোগই পায় না?

.

আফ্রিকার কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে, বাংলাদেশের কোনো বস্তিতে কিংবা বিশ্বের কোনো দরিদ্র অঞ্চলে হয়তো আজ এমন একটি শিশু বড় হচ্ছে, যার মেধা, কৌতূহল এবং সৃজনশীলতা ইলন মাস্কের চেয়ে কম নয়। কিন্তু সে কি একই শিক্ষা, একই প্রযুক্তি, একই পুঁজি এবং একই সুযোগ পাচ্ছে?

যদি না পায়, তাহলে মানবসভ্যতা কত সম্ভাবনাকে প্রতিদিন হারাচ্ছে?

আমরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, কীভাবে একজন ইলন মাস্ক তৈরি হয়। কিন্তু হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আমাদের বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো কতজন সম্ভাব্য ইলন মাস্ককে হারিয়ে ফেলছে?

কারণ ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট দেশ, জাতি বা শ্রেণির একচেটিয়া সম্পদ নয়। সুযোগই নির্ধারণ করে কে বিশ্বকে বদলে দেবে, আর কে অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।

.

শেষ পর্যন্ত ইলন মাস্কের গল্প সম্পদের গল্প নয়। এটি মানুষের কল্পনাশক্তির গল্প। এটি সেই ক্ষমতার গল্প, যেখানে একজন মানুষ একটি ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি তখনই ঘটবে, যখন ব্যতিক্রমী একজন মানুষ নয়, কোটি কোটি মানুষ নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।

হয়তো এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো প্রান্তে একটি শিশু মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করছে। তার কাছে নেই আধুনিক প্রযুক্তি, নেই বিনিয়োগকারী, নেই প্রভাবশালী পরিচয়। আছে শুধু একটি স্বপ্ন। আমরা জানি না সেই শিশুটির নাম কী। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে সম্পদ নয়, মানুষের সম্ভাবনা। প্রশ্ন হলো আমরা কি সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছি?

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

rahman.mridha@gmail.com