মাঠে বল গড়াতে বাকি আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার কম। চার বছর পরপর এই সময়টায় ফুটবলপ্রেমীদের বুকে যে রোমাঞ্চের ঢেউ জাগার কথা, ২০২৬ বিশ্বকাপে তা যেন ঢাকা পড়ে গেছে একরাশ মেঘে। মাঠের ফুটবলকে ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে মার্কিন ইমিগ্রেশনের কড়াকড়ি আর রাজনৈতিক কূটচাল। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই মাঠের বাইরের নানা বিতর্কে টুর্নামেন্টটি রূপ নিয়েছে এক মহাসংকটে। আর সেই সংকটের সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি খেলেন আফ্রিকার শীর্ষ রেফারি ওমর আরতান।

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও প্রবেশসংক্রান্ত জটিলতায় দর্শকেরা সমস্যায় পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কা ছিল অনেক আগে থেকেই। কিন্তু খোদ ফিফার অফিশিয়াল রেফারিই যে মার্কিন ইমিগ্রেশনের মারপ্যাঁচে পড়ে দেশে ফেরত যাবেন, তা কে ভেবেছিল! বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত হয়েও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি সোমালিয়ার এই রেফারি।

গত বছর আরতানের জন্য ছিল স্বপ্নের মতো। ২০২৫ সালের জুনে প্রথম সোমালি রেফারি হিসেবে পরিচালনা করেন কাফ চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল। এরপর চিলিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেন, যার মধ্যে ছিল তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচও।

.

বছর শেষে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেও ম্যাচ পরিচালনার পাশাপাশি জেতেন আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (কাফ) বর্ষসেরা পুরুষ রেফারির পুরস্কার। এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সেরই স্বীকৃতি হিসেবে গত মার্চে তিনি পান ২০২৬ বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনার টিকিট। প্রথম সোমালি হিসেবে বিশ্বকাপে বাঁশি বাজানোর যে স্বপ্ন তিনি দেখছিলেন, তা মায়ামি বিমানবন্দরে এসে ধাক্কা খেল এক কর্কশ দেয়ালে।

অন্য ৫১ জন রেফারির সঙ্গে যোগ দিতে মায়ামিতে পৌঁছেছিলেন আরতান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাঁকে টানা ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এরপর কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরত পাঠানো হয় তাঁকে। অথচ আরতানের দাবি, তাঁর সব কাগজপত্র ও ভিসা একদম ঠিকঠাক ছিল। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে এখন মোগাদিশুর পথে আরতান।

.যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না পেরে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়লেন আফ্রিকার সেরা রেফারি.

এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক রেফারিরই স্বপ্ন থাকে বিশ্বকাপে যাওয়ার। যখন আপনি নির্বাচিত হন, তখন মনে হয়, বছরের পর বছরের সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।’ কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের এক সিদ্ধান্তে সেই সার্থকতা এখন ধূলিসাৎ।

হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের নেতৃত্ব দেওয়া অ্যান্ড্রু গিলিয়ানি অবশ্য কাস্টমস ও বর্ডার প্যাট্রোলের এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারছি না, তবে কাস্টমস ও বর্ডার প্যাট্রোল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি সঠিক ছিল এবং আমি সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি।’ তাঁর এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনের অধীনে কেউই বিশেষ সুবিধা পাবে না—না খেলোয়াড়, না রেফারি, আর না সাধারণ সমর্থক।

.

এ ঘটনা ফিফাকে ফেলেছে এক চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। যেখানে টুর্নামেন্টের সেরা মেধাবীদের মেলবন্ধন হওয়ার কথা, সেখানে ফিফার নিজের প্রতিনিধিরই এমন হেনস্তা বিশ্ব–ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মানবাধিকারবিষয়ক প্রচারণা সংগঠন ‘ফেয়ার’-এর নির্বাহী পরিচালক পিয়ারা পওয়ার যেমনটি বলেন, ‘ফিফার কোনো অফিশিয়াল রেফারিকে এভাবে প্রবেশে বাধা দেওয়া বিশ্বকাপ শুরুর আগে এক অভূতপূর্ব ও অস্বাভাবিক ঘটনা। আসলে বিশ্বকাপ চালাচ্ছে কে? ফিফা, নাকি যুক্তরাষ্ট্র সরকার?’

সাবেক আর্সেনাল ও ইংল্যান্ড তারকা ইয়ান রাইটও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ইনস্টাগ্রামে তিনি লিখেছেন, ‘প্রতি কয়েক ঘণ্টা পরপরই নতুন একটি খবর আসছে। কখনো দর্শককে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, কখনো খেলোয়াড়, কখনো কর্মকর্তা, আবার কখনো সাংবাদিক, আর এখন রেফারি। এটি এক বিশৃঙ্খলার বিশ্বকাপ।

.বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল : দলীয় শক্তিতে কে কোথায় সেরা .

অথচ অতীতে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপকে ‘ভিসামুক্ত’ করতে দর্শকের জন্য চালু করেছিল বিশেষ ‘ফ্যান আইডি’। ২০২২ সালে কাতারও এনেছিল ‘হায়া কার্ড’, যা ছিল একই সঙ্গে ভ্রমণের অনুমতি ও স্টেডিয়ামের টিকিট। কিন্তু মার্কিন মুলুকে এবার চিত্রটা একদম উল্টো। টিকিটের আকাশচুম্বী দাম, হোটেল বুকিং ও পরিবহন খরচ নিয়ে সমালোচনা তো ছিলই, এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্কিন ইমিগ্রেশনের খাঁড়া। স্টেডিয়াম এলাকায় ‘আইসিই’ (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট)-এর উপস্থিতি দর্শকের মনে তৈরি করেছে চরম আতঙ্ক।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য অতীতে বড় বড় কথা বলেছিলেন। ২০২৩ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কারণ, বালির গভর্নর ইসরায়েল দলকে সেখানে স্বাগত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

তখন ইনফান্তিনো বলেছিলেন, ‘কোনো দল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে তাদের সমর্থক ও কর্মকর্তাদের অবশ্যই আয়োজক দেশে নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। না হলে সেটা কোনো বিশ্বকাপই নয়।’ অথচ আজ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে তাঁর সেই বাণীই চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। গত দুই বছরে মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ইনফান্তিনোর সখ্য এবং বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিতর্কিত ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ প্রদান করা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসন তাদের কড়া নীতি থেকে একচুলও নড়েনি।

.

২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প ১২টি দেশের ওপর যে পূর্ণ ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন, তার মধ্যে সোমালিয়ার পাশাপাশি বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া ডিআর কঙ্গো, ইরান এবং হাইতিও ছিল। ড্রয়ের মাত্র দুই দিন আগে মিনেসোটায় সোমালি কমিউনিটির ওপর ইমিগ্রেশন অভিযানের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সোমালিয়া, যা প্রায় কোনো দেশই নয়, তাদের কিছুই নেই...ভুল পথে যাব, যদি আমরা আমাদের দেশে এমন অযোগ্য মানুষদের গ্রহণ করতে থাকি।’ আরতানের ভাগ্য যে সেই বর্ণবাদী ও রাজনৈতিক রাজনীতির শিকার হবে, তা বোধ হয় তখনই ঠিক হয়ে গিয়েছিল।

ফিফা অবশ্য হাত ধুয়ে ফেলে জানিয়েছে, আয়োজক দেশের ভিসা বা ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো হাত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সব জেনেও ফিফা কেন পরিস্থিতি এ পর্যায়ে যেতে দিল?

.ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারবে ইরান.

এখন ফিফার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আগামী রোববার। সেদিন ইরান দলের যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর কথা। ইরান ইতিমধ্যেই অভিযোগ করেছে, তাদের ১৫ জন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যাকরুম স্টাফকে ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ইরান দলের জন্য বিশেষ এক অবাস্তব নিয়ম করা হয়েছে—তারা মেক্সিকোর তিহুয়ানা হয়ে প্রতিটি ম্যাচের জন্য সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে পারবে! এখন যদি ইরান দল নির্ধারিত ম্যাচে অংশ নিতে না পারে, তবে তা হবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি।

* শুধু আরতান বা ইরানই নয়, মার্কিন প্রশাসনের এই কড়াকড়ির শিকার হয়েছেন আরও অনেকেই:

* সুইস ফুটবলার ব্রেল এমবোলোর ভিসা পর্যালোচনার আওতায় রাখায় তিনি দলের সঙ্গে দেরিতে যোগ দেন।

* ইরাকের তারকা খেলোয়াড় আইমেন হুসেইনকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

* দক্ষিণ আফ্রিকা দল সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি কয়েকজন সদস্যের ভিসা মঞ্জুর না হওয়ায়।

* সেনেগাল দলের স্টাফদের জুতা খুলিয়ে দীর্ঘ সময় তল্লাশি করায় বর্ণবাদের অভিযোগ উঠেছে।

* উজবেকিস্তান দলকে বোমা শনাক্তকারী কুকুর দিয়ে তল্লাশি করার ভিডিও তো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ভাইরাল।

* বহু স্কটিশ সমর্থকের শেষ মুহূর্তে ‘ইএসটিএ’ ভ্রমণ অনুমতি বাতিল করা হয়েছে, ফলে আগে থেকে টিকিট ও হোটেল বুক করে রাখা সাধারণ সমর্থকেরা পড়েছেন বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে।

২০১৮ ও ২০২২ সালের নানা বিতর্কের পর ফুটবলপ্রেমীরা আশা করেছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপটি হবে শুধুই মাঠের লড়াইয়ের। কিন্তু মাঠের বল গড়ানোর আগেই ওয়াশিংটনের অভিবাসননীতি যেভাবে বুট জুতা পায়ে ফুটবল মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে, তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার—এই বিশ্বকাপ হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোরতার এক প্রদর্শনী হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।