তিন বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে দুই চোখের দৃষ্টি হারান আবদুল মালেক। দরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়ায় উন্নত চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার সুযোগ পাননি। অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। ২০১৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন মালেক। ১৩ বছর ধরে শিশুদের পড়াচ্ছেন একটি বিদ্যালয়ে। দৃষ্টিহীন চোখ নিয়ে শিশুদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি।

আবদুল মালেক শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার বরুণপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি নড়িয়ার ৫২ নম্বর পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি তিনি শিশুদের আবৃত্তি, গান ও তবলা বাজানো শেখান। ইতিমধ্যে উপজেলাজুড়ে তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নড়িয়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল আজিজ ছৈয়াল ও রোকেয়া বেগম দম্পতির ছেলে আবদুল মালেকের জন্ম ১৯৮৭ সালে। ১৯৯০ সালে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে উন্নত চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি। ১৯৯২ সালে তাঁকে রাজধানীর একটি মিশনারি স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের একটি স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর গ্রামে ফিরে নড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকে (সম্মান) ভর্তি হন। সেখান থেকে ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন তিনি।

২০১৩ সালে বিভিন্ন স্থানে চাকরির আবেদন করতে থাকেন আবদুল মালেক। ওই বছরের নভেম্বরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। প্রথমে তাঁকে পদায়ন করা হয় কেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যা তাঁর বাড়ি থেকে অন্তত ১০ কিলোমিটার দূরে। পরে ২০২৩ সালে তাঁকে বাড়ির কাছে ৫২ নম্বর পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়।

মালেকরা দুই ভাই ও চার বোন। এক ভাই প্রবাসে থাকেন। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। ২০০৬ সালে বাবার মৃত্যু হয়। মালেকের সংসারে স্ত্রী ও তিন শিশুসন্তান আছে। বড় ছেলে তাঁরই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলের সাহায্যে ব্যাটারিচালিত একটি স্কুটিতে বাড়ি থেকে স্কুলে যাতায়াত করেন।

মালেকের স্ত্রী নয়নমণি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পড়ালেখা করেছেন। তিনি মানুষের বোঝা হয়ে থাকতে চাননি। নিজের দৃষ্টিশক্তি নেই; অথচ তিনি সমাজের আলো ছড়ানোর কাজে যুক্ত হয়েছেন। অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে আজকের এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আমি তাঁর স্ত্রী হিসেবে খুবই গর্ববোধ করি।’

মালেক শিশু শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ান। ল্যাপটপে রিডিং সফটওয়্যারের সাহায্যে বইয়ের বিষয়বস্তু শুনে শিক্ষার্থীদের পড়া বুঝিয়ে দেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সংগীত এবং হারমোনিয়াম ও তবলা বাজানো শেখান। আবদুল মালেক বলেন, ‘আমি এই পৃথিবীর রং কেমন জানি না। এখানে কেমন আলো, তা-ও জানি না। কিন্তু জ্ঞানের আলো নিয়ে জীবনের পথ ধরেছি। শিক্ষকতা অনেক চ্যালেঞ্জিং পেশা। ১৩ বছর ধরে ছোট বাচ্চাদের শেখাচ্ছি, নিজেও শিখছি। এ সময়ের মধ্যে কখনো বাধা বা সংকটে পড়তে হয়নি।’

নড়িয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আবদুল মালেকের দৃষ্টিশক্তি নেই, তাতে কী হয়েছে, তিনি জ্ঞানের আলো দিয়ে আমাদের শিশুদের শেখাচ্ছেন। অন্য অনেক শিক্ষকের চেয়ে তিনি ভালো করছেন। আমরাও তাঁর প্রতি যত্নবান আচরণ করছি। প্রথমে তাঁর বাড়ি থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরের একটি স্কুলে পদায়ন ছিল। আমরা তাঁকে বাড়ির কাছের একটি স্কুলে বদলি করেছি। এখন খুব সহজেই তিনি স্কুলে যাতায়াত করতে পারেন।’

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল কাইয়ুম খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আবদুল মালেক শুধু একজন ভালো শিক্ষকই নন; তিনি একজন গুণী সংগীতশিল্পী। তাঁরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। বিদ্যালয়ে তিনি পড়ানোর পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চা ধরে রেখেছেন। শিশুরা তাঁর কাছে গান ও তবলা শিখছে।