দেশজুড়ে ধারাবাহিকভাবে শিশু ও নারীর ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনায় বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেছেন মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভার সদস্যরা। তারই অংশ হিসেবে ‘সকল শিশু ও নারীর নিরাপত্তা চাই: ধর্ষক-নিপীড়কের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’ স্লোগানে আজ শুক্রবার বিকেল চারটায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারার পাদদেশ মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনে বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদ ও ঢাকা মহানগরের সদস্য এবং উপদেষ্টাসহ শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন।

শিশু ও নারীর ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনার বিচার দাবি এবং এসব ঘটনায় শোক জানিয়ে কালো পোশাক পরে মানববন্ধনে আসেন মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভার সদস্যরা। মানববন্ধনে বিচারের দাবিসংবলিত ব্যানারের পাশাপাশি ছিল বিভিন্ন বক্তব্য লেখা প্লেকার্ডও। তাতে লেখা ছিল, ‘ধর্ষণ-নিপীড়ককে সামাজিকভাবে বয়কট করুন’, ‘চাই বিচার, চাই দৃষ্টান্ত’, ‘বলাৎকার ট্যাবু নয়, বলাৎকাকারীর বিচার নিশ্চিত করুন’, ‘সব পক্ষের ঐক্য, হোক শিশু নির্যাতন বন্ধ’, ‘ধর্ষক নয়, ধর্ষিতার মানববন্ধন সবার আগে’সহ নানা স্লোগান লেখা ছিল।

মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভার মানববন্ধনে যোগ দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউল করিম। বক্তব্যে তিনি নিজের বিচারক ও আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, অপরাধীরা আইনের নানা ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যান। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটে। তিনি সব কটি ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

শিক্ষক ও বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের উপদেষ্টা মাহবুব পারভেজ পল্লবীতে নৃশংসভাবে আট বছরের শিশুকে হত্যার ঘটনাসহ সব ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। পল্লবীর ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ঘটনার তাৎক্ষণিক বিচার হওয়া উচিত।

উন্নয়নকর্মী, শিক্ষক ও বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সহসভাপতি নূর ই আলম বলেন, ধর্ষক আইনের ফাঁক দিকে বেরিয়ে যায়, খুনি বেরিয়ে যায়—এটি চলতে পারে না। এভাবেই সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে।

প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নূর ই আলম বলেন, ‘আমরা আপনাদের সমর্থন দিয়েছি অচলাবস্থা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করার জন্য। আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ চাই, সেটি নিশ্চিত করুন।’

মানববন্ধনে শিক্ষক ও বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সহসভাপতি রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী বলেন, ‘নারী ও শিশুদের প্রতি অন্যায়ের বড় কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতি যেন বন্ধ হয়, তার দাবিতে আমরা আজকে এখানে দাঁড়িয়েছি।’ তিনি বলেন, মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভা সব সময়ই বিচারহীনতা, নিপীড়ন আর অন্যায়ের বিপক্ষে।

মানববন্ধনে যোগ দিয়ে মনোরোগবিশেষজ্ঞ মাহমুদা মুহসিনা সবাইকে নিজ নিজ জায়াগা থেকে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই নিজেদের জায়গা থেকে সচেতন হলে এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা যাবে।’

মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক আশফাক উজ জামান বলেন, ‘আমরা চাই রাষ্ট্র সব অপরাধীর বিচার করবে। কেউ অপরাধ করে যেন পার না পায়, সেটি নিশ্চিত করবে। প্রতিটি অপরাধের বিচার হবে।’

মানববন্ধনে এসে নিজের নিরাপত্তা চান বন্ধুসভার ঢাকা মহানগরের পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক মুর্শিদা খন্দকার। তিনি বলেন, ‘আর যেন এমন কোনো ঘটনা না ঘটে, সেটা চাই আমরা। একজন নারী হিসেবে আমি আমার নিরাপত্তা চাই।’

মানববন্ধনে যোগ দিয়ে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন–ধর্ষণের ঘটনায় বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কথা উল্লেখ করে সাংবাদিক বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘এসব ঘটনায় এমন শাস্তি দিতে হবে, যেন ধর্ষকের বুক কাঁপে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর আগে।’

ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিলের পরিচালক নাবিলা দুর্দানা বলেন, ‘সব ধর্ষকের ফাঁসি চাই। আমরা আমাদের বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ সমাজ চাই।’ পাশাপাশি ধর্ষকের পক্ষের আইনজীবীদের বর্জন করার দাবিও জানান তিনি।

দেশে ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনায় বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কথা উল্লেখ করে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক বলেন, এসব ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে ধর্ষকদের থামানো যাবে না। বক্তব্যে তিনটি দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের প্রচলিত নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের হালনাগাদ করতে হবে; ছেলে ও মেয়েশিশু উভয়ের ক্ষেত্রে ধর্ষণ ও নিপীড়নকে অপরাধ হিসেবে দেখে সবগুলো ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হওয়া বলাৎকারের বিচার করতে হবে; নিপীড়নের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মাদক ও পর্নোগ্রাফি আইনের সত্যিকারের প্রয়োগ করা এবং রাষ্ট্রকে নারী ও শিশুবান্ধব করার দাবিও জানান তিনি।

মানববন্ধনে নিপীড়নবিরোধী গান পরিবেশন করেন বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হৃদয় সৈকত। এতে আরও বক্তব্য দেন বন্ধুসভার ঢাকা মহানগরের সহসভাপতি মো. মামুন হোসাইন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেঘা খেতান।

শিশু ও নারীর ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনায় দেশব্যাপী বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে মানববন্ধন করেছেন মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভার সদস্যরা। বন্ধুসভার জাতীয় পর্ষদ ও ঢাকা মহানগর ছাড়াও মানববন্ধন হয়েছে চট্টগ্রাম, রংপুর, সিলেট, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, জামালপুর, ফেনী, নীলফামারী, ঝালকাঠি, কুড়িগ্রাম, গোপালগঞ্জ, পঞ্চগড়, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, মুন্সিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। এ ছাড়া পৃথক মানববন্ধন হয়েছে চকরিয়া, নালিতাবাড়ী, রায়গঞ্জ, ভৈরব ও পটিয়ায়। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও মানববন্ধন করেছেন মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভার সদস্যরা।