দুই দফা বদলির পরও দাপ্তরিক আদেশ অমান্য করে হাইওয়ে পুলিশের ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুলিশ সুপারের (এসপি) দায়িত্ব ছাড়ছেন না কাজী মো. ছোয়াইব। নতুন দায়িত্ব পাওয়া এসপি মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকেও দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছেন না তিনি। এমনকি বদলির আদেশের পর ১১ মে পর্যন্ত ১৬টি চিঠিতে তিনি ৭৭ কর্মীকে বিভিন্ন জায়গায় রদবদল করেছেন।

হাইওয়ে পুলিশের ময়মনসিংহ অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার রণজয় চন্দ্র মল্লিক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কাজী মো. ছোয়াইব স্যার আজ (বুধবার) পর্যন্ত দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। অপারেশনাল কার্যক্রমগুলো রহমত উল্লাহ স্যার করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। সদর দপ্তর থেকে আমাদের মৌখিকভাবে বলা হয়েছে, ওনার (ছোয়াইব) কোনো নির্দেশনা যেন না মানা হয়।’

২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল ময়মনসিংহ অঞ্চলের এসপি হিসেবে যোগদান করেন কাজী মো. ছোয়াইব। চলতি বছরের ৫ এপ্রিল তাঁকে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে বদলি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। ৯ এপ্রিল অন্য একটি আদেশে দায়িত্ব বুঝিয়ে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে ছাড়পত্র নেওয়ার নির্দেশ দেয় হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তর; কিন্তু কাজী মো. ছোয়াইব নির্দেশনা অমান্য করে ময়মনসিংহে থেকে যান।

পরে ১৯ এপ্রিল আরেকটি আদেশে তাঁকে হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। আদেশে বলা হয়, কাজী মো. ছোয়াইব অদ্যাবধি হাইওয়ে পুলিশের ময়মনসিংহ অঞ্চলে অবস্থান করছেন, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ মোতাবেক অসদাচরণের শামিল। এমতাবস্থায় বিভাগীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থিমূলক আচরণের কারণে তাঁকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হলো। চিঠি জারির দিনই পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে ২০ এপ্রিল সকাল ১০টার মধ্যে হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা এ আদেশ দেন।

অন্যদিকে পৃথক আরেকটি আদেশে হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর অঞ্চলের এসপি মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের এসপি হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ২০ এপ্রিল হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজির কাছে চিঠি পাঠিয়ে দায়িত্ব নেন; কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস পেরিয়ে গেলেও ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়ে বসতে পারেননি মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ।

রহমত উল্লাহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ভদ্রতার কারণে সেখানে যেতে পারছি না। তিনি আমার জুনিয়র। অনভিপ্রেত পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, সে কারণে সেখানে না গেলেও দাপ্তরিক কাজ আমি চালিয়ে যাচ্ছি। তিনি না থাকলে হয়তো আমি সপ্তাহে এক-দুই দিন সেখানে যেতাম। ওনার আত্মসম্মান না থাকতে পারে, আমার তো আছে। সেই চিন্তা করে সেখানে যাচ্ছি না।’ তিনি বলেন, ‘অফিসার ফোর্সের বেতন–ভাতা আটকে রাখতে চেষ্টা করেছিল। পরে আমার স্বাক্ষরে বেতন হয়েছে। তাঁকে (পুলিশ সুপার) সংযুক্ত করা হয়েছে সদর দপ্তরে। তার পরেও তিনি কেন কার্যালয় ছাড়ছেন না, সেটা তিনি বলতে পারবেন। যথাসময়ে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

জানতে চাইলে কাজী মো. ছোয়াইব বলেন, ‘আমাকে যেখানে বদলি করা হয়েছে, সেখানে আগে চার বছর ছিলাম। এখন আবার সেখানে বদলি করায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য স্বরাষ্ট্রসচিব ও আইজিপির কাছে আবেদন জানিয়েছি। যেহেতু সেখান থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি, তাই এখনো এখানে আছি। আমাকে মৌখিকভাবে এখানেই থাকতে বলা হয়েছে।’ বেতন আটকানোর বিষয়ে বলেন, ‘কর্মীদের বেতন আমি অ্যাকাউন্টস অফিসে যথাসময়ে পাঠালেও কী কারণে দেরি হয়েছে জানি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে অফিস চালাতে তেমন সমস্যা হচ্ছে না। যতটুকু সমস্যা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত আসার পর পুষিয়ে নেওয়া যাবে।’

কাজী মো. ছোয়াইবকে ৫ এপ্রিল বরিশালে বদলি করা হলেও তা না মানায় ২০ এপ্রিল দাপ্তরিকভাবে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে গত ৯ এপ্রিল থেকে ১১ মে ৩২ দিনে ১৬টি চিঠির মাধ্যমে মোট ৭৭ কর্মীকে রদবদল করা হয়। ৯ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল ৩৯ জনকে এবং ২৬ এপ্রিল থেকে ১১ মে ৩৮ জনকে বদলি করা হয়।

হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়ের অধীন ভরাডোবা, শ্যামগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, কটিয়াদী ও নান্দাইল থানায় মোট ১৭৭ জন সদস্য আছেন। একজন এসপি ও একজন এএসপি প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখভাল করেন। মুক্তকণ্ঠের হাতে আসা নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ২৬ মার্চ ভরাডোবা থেকে এসআই সাব্বির হাসানকে নান্দাইলে বদলি করা হলেও ১৮ এপ্রিল আগের বদলির আদেশ বাতিল করা হয়। কনস্টেবল জয়নাল আবেদিনকে ২৬ এপ্রিল ভরাডোবা থেকে আঞ্চলিক সদর দপ্তরে বদলি করা হলেও ৭ মে আবার ভরাডোবায় পাঠানো হয়। কনস্টেবল মো. মোস্তফা কামাল ও মো. আবু সাঈদকে ১৪ এপ্রিল ভরাডোবা থেকে আঞ্চলিক সদর দপ্তরে বদলি করা হলেও ১৭ এপ্রিল আবার ভরাডোবায় বদলি করা হয়। নারী কনস্টেবল মিতু আক্তারকে ১৮ এপ্রিল আঞ্চলিক সদর দপ্তর থেকে শ্যামগঞ্জে পাঠানো হয়; কিন্তু ৩০ এপ্রিল আবার তাঁকে আঞ্চলিক সদর দপ্তরে বদলি করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বদলি হওয়া এক কনস্টেবল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের বদলিতে পরিবার নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ সদস্যরা হ্যারাজের শিকার হন।’

তবে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে কাজী মো. ছোয়াইব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কর্মীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বদলি‍গুলো করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেকে নতুন যোগদান করেছেন। আবার অনেকে প্রয়োজন বিবেচনায় বদলির আবেদন করেছিলেন।’

যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত আইজি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কাজী মো. ছোয়াইবকে বদলি ও সংযুক্তির আদেশ দেওয়া হলেও তিনি মানেননি। তিনি এখন যথারীতি অনুপস্থিত। তিনি কার্যালয় আটকে রেখেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বদলির আদেশের পর কোনো কর্মীকে বদলি করলে সেগুলো কার্যকর হবে না। হি ইজ নো মোর। আমি জানিয়ে দিয়েছি, তার কোনো আদেশ আর কার্যকর হবে না।’