বারবার ব্যর্থ হয়েও থামেননি। শৈশবে দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করেছেন, অভিনয়জীবনের শুরুতে বারবার অডিশন দিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। গুরুত্বহীন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু কখনো থেমে যাননি। সেই তিনিই এখন হিন্দি সিনেমার শক্তিশালী অভিনেতা। তিনি আর কেউ নন, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি। আজ ১৯ মে এই অভিনেতার জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক অভিনেতার জীবন ও ক্যারিয়ারে।

গ্রামের ছেলে থেকে বলিউডের স্বপ্ন
১৯৭৪ সালের ১৯ মে ভারতের উত্তর প্রদেশের মুজাফফরনগরের ছোট শহর বুধানায় জন্ম নেন নওয়াজউদ্দিন। কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতার শৈশব কেটেছে খুব সাধারণ পরিবেশে। পরিবারে ভাইবোনের সংখ্যা ছিল অনেক। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ছিল নিত্যসঙ্গী।

শৈশবে ধনেপাতাও বেচতেন। একটি ঘটনা এমন—২০০ রুপির ধনেপাতা কিনেছিলেন নওয়াজউদ্দিন। সেগুলো খুচরা বিক্রি করবেন কিছু লাভ করার জন্য। পাতাগুলো ক্রমেই বাদামি রং ধারণ করতে শুরু করলে তিনি দৌড়ে পাতাওয়ালাকে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার পাতা তো মরে যাচ্ছে।’ পাতাওয়ালা তাঁকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘বারবার পানি ছিটাতে হবে, তাহলেই পাতা সতেজ থাকবে।’ নওয়াজের পকেটে সেদিন তেমন টাকা ছিল না। টিকিট ছাড়া ট্রেনে চড়েছিলেন তিনি। কিন্তু নির্দিষ্ট স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ধনেপাতা ঠিকই বাদামি হয়ে গিয়েছিল। তাঁর ২০০ রুপিই জলে গিয়েছিল সেদিন।

.

ছোটবেলা থেকেই নওয়াজউদ্দিন ছিলেন কিছুটা চুপচাপ স্বভাবের। সিনেমা দেখতে ভালো লাগত, কিন্তু তখনো অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা ভাবেননি। কলেজে রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা শেষে কিছুদিন গুজরাটের একটি কারখানায় কেমিস্ট হিসেবে কাজও করেন।

কিন্তু সেই জীবন নওয়াজউদ্দিনকে টানতে পারেনি। পরে দিল্লিতে চলে আসেন। সেখানে রাতের বেলা নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেছেন। দিনে থিয়েটার করতেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, অনেক সময় পকেটে বাসভাড়াও থাকত না।

এনএসডি থেকে মুম্বাই
দিল্লিতে থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা নওয়াজউদ্দিনকে নিয়ে যায় ভারতের বিখ্যাত অভিনয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনএসডি)। সেখানে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। কিন্তু এনএসডি থেকে বের হলেই যে কাজ পাওয়া যায়, বাস্তবতা ছিল তার উল্টো।

স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাইয়ে এলেও প্রথম কয়েক বছর ছিল ভয়াবহ কঠিন। একের পর এক অডিশনে বাদ পড়তেন। কারণ, তাঁর চেহারায় তথাকথিত ‘নায়কোচিত’ কিছু ছিল না। গায়ের রং, উচ্চতা, চেহারা—সবকিছু নিয়েই শুনতে হয়েছে অপমানজনক কথাবার্তা।
নওয়াজউদ্দিন একবার বলেছিলেন, ‘মানুষ আমাকে বলত, তুমি অভিনেতা হতে পারবে না। তোমাকে দেখে কেউ সিনেমার নায়ক ভাববে না।’

.

ছোট চরিত্র, নামহীন উপস্থিতি
নওয়াজউদ্দিনের ক্যারিয়ারের শুরুর গল্প আজ বলিউডে প্রায় কিংবদন্তি। ‘সাফারোশ’–এ খুব ছোট একটি চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এরপর ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’সহ অনেক সিনেমায় ক্ষণিকের উপস্থিতি ছিল তাঁর।

দর্শকেরা তখন হয়তো নওয়াজউদ্দিনের নামও জানতেন না। কোনো কোনো সিনেমায় সংলাপও ছিল না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি।

এ সময় নওয়াজউদ্দিন একাধিকবার বাড়িভাড়া দিতে না পেরে বিপদে পড়েছেন। বন্ধুদের সঙ্গে ছোট ঘরে থেকেছেন। অনেক দিন ঠিকমতো খাবারও জোটেনি।
নওয়াজউদ্দিন বলেন, জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে একবার চার হাজার রুপি সম্মানী পান তিনি। সেদিন এই অর্থের অর্ধেক তাঁকে দিয়ে দিতে হয়েছিল তাঁর সমন্বয়কারীকে। বাকি অর্থ থেকে হোটেলের ভাড়া দিয়েছিলেন ১ হাজার ৮০০ রুপি আর ২০০ রুপি দিয়ে রিকশায় চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই অভিনেতা জানান, শুরুর দিকে আত্মবিশ্বাস আর আবেগে ভরপুর থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। অভিনেতার ভাষায়, ‘শুরুর দিকে আত্মবিশ্বাস থাকে। কিন্তু বারবার সংগ্রামের মুখে পড়লে সেই আত্মবিশ্বাস কমতে শুরু করে। তখন মনে হয়, আমি যা শিখেছি, সেটাই কি ভুল?’

.

দীর্ঘ সময় কাজ না পাওয়ায় নওয়াজউদ্দিন নিজের যোগ্যতা নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন। কখনো মনে হতো ভাগ্য তাঁর বিরুদ্ধে, আবার কখনো মনে হতো, তিনি হয়তো এই পেশার জন্যই উপযুক্ত নন।

নওয়াজউদ্দিন স্বীকার করেন, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি নিজেকে দুর্ভাগা মনে করতেন। বড় কোনো সুযোগ এলেই সেটি হাতছাড়া হয়ে যেত। এমনও হয়েছে, কাজ পাওয়ার খবর পরিবার-বন্ধুদের জানালেন, কিন্তু শুটিং শুরুর আগেই তাঁকে বাদ দেওয়া হলো, কখনো আবার না জানিয়েই।

সংগ্রামের সেই দিনগুলো শুধু আর্থিক কষ্টেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মানসিক চাপও ছিল প্রবল। নওয়াজ বলেন, ‘অনেক সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করত। কেঁদেছিও, চারপাশে তাকিয়ে দেখতাম, কেউ দেখছে কি না।’ একসময় এমনও দিন গেছে, যখন খাবার বলতে ছিল শুধু বিস্কুট। সকাল, দুপুর, রাত—তিন বেলাই সেই বিস্কুট খেয়েই কাটিয়েছেন নওয়াজ। আজও সেই বিস্কুট নওয়াজের কাছে শুধু খাবার নয়, বরং এক কঠিন সময়ের স্মৃতি। নওয়াজের কথায়, ‘আজও যদি সেই বিস্কুট খাই, সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে হয়, আমার কিছুই নেই। সেই স্বাদে এখনো কষ্ট মিশে থাকে।’

.

‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’ বদলে দিল সব
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভাগ্য বদলাতে শুরু করে পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের হাত ধরে। ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ সিনেমায় নওয়াজউদ্দিনের অভিনয় নজর কাড়ে। এরপর ‘পিপলি লাইভ’ ও ‘কাহানি’ তাঁকে পরিচিতি দেয়।

কিন্তু সত্যিকারের বিস্ফোরণ ঘটে ‘গ্যাংস অব ওয়েসিপুর’ দিয়ে। ফয়জল খানের চরিত্রে নওয়াজউদ্দিনের অভিনয় ভারতীয় সিনেমায় নতুন এক অধ্যায় তৈরি করে। সংলাপ বলার ভঙ্গি, চোখের ভাষা, চরিত্রের ভেতরের অন্ধকার—সব মিলিয়ে দর্শক বুঝে যায়, বলিউড এক অসাধারণ অভিনেতা পেয়ে গেছে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

.

একের পর এক ভিন্নধর্মী চরিত্র
নওয়াজউদ্দিন কখনো নিজেকে এক ধরনের চরিত্রে আটকে রাখেননি। ‘দ্য লাঞ্চবক্স’–এ সংবেদনশীল মানুষ, ‘বদলাপুর’–এ ভয়ংকর অপরাধী, ‘মাঝি: দ্য মাউন্টেন ম্যান’–এ সংগ্রামী শ্রমিক, ‘রমণ রাঘব ২.০’–এ বিকৃত মানসিকতার সিরিয়াল কিলার—প্রতিটি চরিত্রেই তিনি নিজেকে ভেঙেছেন।

ডিজিটাল যুগেও নওয়াজউদ্দিন সমান সফল। ‘সেক্রেড গেমস’–এ গণেশ গাইতোন্ডে চরিত্র তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়। তাঁর সংলাপ, অভিনয়, উপস্থিতি—সবই হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়।

শাহরুখের সঙ্গে অভিনয়, কিন্তু নিজের আলাদা জায়গা
বলিউডে অনেকেই নওয়াজউদ্দিনকে ‘অভিনেতাদের অভিনেতা’ বলেন। শাহরুখ খানের সঙ্গে ‘রইস’–এ অভিনয় করে তিনি দেখিয়েছেন, বড় তারকার পাশেও নিজের উপস্থিতি কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
সালমান খানের সঙ্গে ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ ও ‘কিক’ সিনেমায় অভিনয় দিয়ে দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

.

ব্যক্তিজীবনের বিতর্ক
ক্যারিয়ারের মতো ব্যক্তিজীবন অবশ্য সব সময় সুখের ছিল না। স্ত্রী আলিয়া সিদ্দিকির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বহুবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিচ্ছেদ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আইনি লড়াই—সবই এসেছে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। আলিয়া অভিযোগ করেছিলেন, সংসারে তিনি মানসিকভাবে অবহেলিত ছিলেন। একসময় তাঁদের বিচ্ছেদের খবর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে আবার সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টাও দেখা যায়। নওয়াজউদ্দিনের আত্মজীবনী ‘অ্যান অর্ডিনারি লাইফ’ প্রকাশের পরও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেখানে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে বইটির প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধও করা হয়।

.নিজেকে তথাকথিত নায়ক হিসেবে মেলে ধরতে চাই না: নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী.

বলিউডের প্রচলিত নায়কধারণা বদলে দেওয়া অভিনেতা
নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এখানেই—তিনি প্রমাণ করেছেন, বলিউডে সফল হতে চকচকে চেহারা জরুরি নয়; দরকার প্রতিভা, ধৈর্য আর নিজের ওপর বিশ্বাস। যে মানুষ একসময় নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি করতেন, তিনিই আজ বিশ্বের বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হন। তাঁর অভিনয় নিয়ে আলোচনা হয় ইউরোপ-আমেরিকাতেও। বলিউডে তথাকথিত ‘আউটসাইডার’দের জন্য নওয়াজউদ্দিন এক বড় অনুপ্রেরণা। কারণ, তাঁর গল্পটা কেবল সাফল্যের নয়, এটা টিকে থাকার গল্পও। তবে সাফল্যের চূড়ায় উঠেও নিজের শুরুর দিনগুলো ভুলে যাননি নওয়াজ; বরং সেই সংগ্রামই তাঁকে আজকের জায়গায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। ‘আমি কোনো কিছুই ভুলে যাইনি বরং নিজের পা মাটিতে রাখতে সব সময় পুরোনো দিনের কথা মনে করি,’ বলেন নওয়াজ। তবে নওয়াজের আক্ষেপ তিনি যে ধরনের সিনেমা করেন সেগুলো খুব কম শো পায়। অভিনেতার ভাষ্যে, ‘আমাদের মতো অভিনেতাদের ছবি অত্যন্ত কম হল পায়। মাত্র দুটি শো পায়। তা-ও একটা সকাল, একটা রাতে। সেখানে তথাকথিত তারকাদের দখলে থাকে সিংহভাগ স্ক্রিন। আমার “আফওয়া”, “জোগিরা সারা রা রা”র ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছিল। এর চেয়ে ছবিগুলো ওটিটিতে মুক্তি পেলে ভালো হতো।’

বলিউড হাঙ্গামা ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে