জন্ডিস আমাদের দেশে খুব পরিচিত একটি অবস্থা। চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা ও বমি ভাবের মতো উপসর্গকে সাধারণত জন্ডিস বলা হয়। তবে জন্ডিস নিজে কোনো রোগ নয়; এটি একটি উপসর্গ, যা শরীরে বিলিরুবিন নামক পদার্থ বেড়ে গেলে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, সাধারণ জন্ডিস কি কখনো লিভার ফেইলিউরের মতো জটিল ও জীবনাশঙ্কাপূর্ণ অবস্থায় রূপ নিতে পারে? উত্তর হলো, হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে পারে, তবে সব জন্ডিসই বিপজ্জনক নয়। বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করে জন্ডিসের মূল কারণের ওপর।

জন্ডিস সাধারণত তিনটি কারণে হতে পারে: ১. হেপাটাইটিস বা লিভারের সংক্রমণ (যেমন হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ই ভাইরাস); ২. লিভারের কোষের ক্ষতি (অ্যালকোহল, ওষুধ বা টক্সিনের কারণে); ৩. পিত্তনালির বাধা (পাথর বা টিউমারের কারণে)। এর মধ্যে কিছু কারণ স্বল্পমেয়াদি ও চিকিৎসাযোগ্য, আবার কিছু দীর্ঘ মেয়াদে লিভারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সব জন্ডিসই সাধারণ বা মৃদু নয়। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস দীর্ঘ মেয়াদে লিভারের নীরবে ক্ষতি করে। অনেক সময় রোগী প্রথমে শুধু জন্ডিসের উপসর্গ অনুভব করেন এবং কিছুদিন পর ভালোও হয়ে যান। কিন্তু ভাইরাসটি শরীরে থেকে গেলে এটি ধীরে ধীরে লিভার সিরোসিস বা লিভার ফেইলিউরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। লিভার ফেইলিউর এমন একটি অবস্থা, যেখানে লিভার তার স্বাভাবিক কাজ (বিষাক্ত পদার্থ দূর করা, প্রোটিন তৈরি করা এবং রক্ত পরিষ্কার করা) সঠিকভাবে করতে পারে না। এটি দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী হতে পারে।

ভাইরাল জন্ডিস (বিশেষ করে হেপাটাইটিস এ বা ই) বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সেরে যায় এবং লিভার স্থায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটি বিপদ ডেকে আনতে পারে। যদি রোগীর আগে থেকেই লিভার দুর্বল থাকে, হেপাটাইটিস বি বা সি দীর্ঘদিন ধরে অনির্ণীত থাকে, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ করা হয় অথবা ভুল ওষুধ বা ভেষজ চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়, তাহলে এগুলো লিভারের ওপর চাপ বাড়িয়ে ধীরে ধীরে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, যা একপর্যায়ে লিভার ফেইলিউরে রূপ নিতে পারে।

জন্ডিসের সঙ্গে যদি অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ঘুম ঘুম ভাব, পেট ফোলা বা পানি জমা, রক্তবমি বা কালো পায়খানা, মানসিক বিভ্রান্তি এবং প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়, তবে তা বিপদের ইঙ্গিত হতে পারে। এগুলো লিভার ফেইলিউরের পূর্বাভাস হতে পারে এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।

জন্ডিস প্রতিরোধে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হেপাটাইটিস বি–এর টিকা গ্রহণ, বিশুদ্ধ পানি পান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার মতো নিয়ম মেনে চললে ঝুঁকি অনেক কমানো যায়।

জন্ডিস শুনলেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে এটিকে অবহেলা করাও বিপজ্জনক। সব জন্ডিস লিভার ফেইলিউরে রূপ নেয় না, কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট কারণ ও অবহেলার কারণে এটি জীবনাশঙ্কার দিকে যেতে পারে। তাই সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাই পারে এই জটিলতা থেকে জীবন রক্ষা করতে।