১৯৪৫ সালের এক বিকেল। রোমানিয়ার মারামারেশের যুদ্ধবন্দী শিবিরে হাঙ্গেরিয়ান ও স্লোভাক প্রহরীরা ফুটবল খেলছিলেন। খেলোয়াড় সংকটে পড়ায় একজন যুদ্ধবন্দীকে ডাকা হলো। তাঁর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন হাঙ্গেরির এক পাহারাদার। মুখটা চেনা।
বুদাপেস্ট, ১৯৪২। হাঙ্গেরি-জার্মানির ৫-৩ ম্যাচে জার্মানির হয়ে খেলেছিলেন সেই লোকটি। এই ছোট্ট ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের সূচনা করে। না হলে ফ্রিটজ ওয়াল্টারের নাম হয়তো সাইবেরিয়ার তুষারে হারিয়ে যাওয়া সাড়ে তিন লাখ জার্মানের তালিকায় থেকে যেত।
ফ্রিটজ ওয়াল্টারের জীবন দুটি অধ্যায়ে বিভক্ত—যুদ্ধের আগে ও পরে। মাঝখানে ছিল ভয়ংকর এক সময়। ১৯৪২ সালে জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয় তাঁকে। যুদ্ধ শেষে সোভিয়েত বাহিনীর হাতে বন্দী হন ওয়াল্টার। প্রথমে মার্কিন শিবিরে, পরে রোমানিয়ার মারামারেশ শিগেতু শহরের কাছে এক ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। সেখানে প্রায় ৪০ হাজার বন্দী ছিলেন, যাদের গন্তব্য সাইবেরিয়ার গুলাগ।
ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অবসন্ন অবস্থায় ওয়াল্টার বন্দিশিবিরে দিন কাটাচ্ছিলেন। একদিন হাঙ্গেরিয়ান ও স্লোভাক রক্ষীরা ফুটবল খেলতে দেখে তিনি চোখ ফেরাতে পারেননি। হঠাৎই তাঁকে খেলায় ডাকা হলো। এক হাঙ্গেরিয়ান পাহারাদার তাঁকে চিনে ফেললেন। আগে জার্মান দলের হয়ে ওয়াল্টারকে খেলতে দেখেছিলেন তিনি।
সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ যখন সব জার্মান বন্দীকে সাইবেরিয়ায় পাঠানোর নির্দেশ দিল, সেই পাহারাদারই রক্ষক হয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, এই লোক জার্মান নয়, অস্ট্রিয়ান। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে তিনি ওয়াল্টারকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন। ফলে সাইবেরিয়ার তালিকা থেকে ফ্রিটজ ওয়াল্টারের নাম সরিয়ে নেওয়া হলো এবং তাঁকে ফেরত পাঠানো হলো কাইজারস্লাউটার্নে।
১৯৫৪ বিশ্বকাপে ওয়াল্টার জার্মানির অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানির মনোবল তখন তলানিতে। গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরির কাছে ৮-৩ গোলে হারলেও তুরস্ক, যুগোস্লাভিয়া ও অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে তারা ফাইনালে পৌঁছায়। ফাইনালে আবারও হাঙ্গেরির মুখোমুখি হন তারা। ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জয়ী হয় জার্মানি।
যিনি একসময় সাইবেরিয়ার পথে মৃত্যুর মুখ দেখেছিলেন, তাঁর হাতেই উঠল বিশ্বকাপ ট্রফি।






