‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’—বাঙালির সংস্কৃতিতে এটা খুবই বাস্তব ঘটনা। বাংলা বছর শুরুর ঘটনার মধ্যে দিয়ে এর সূচনা হয়। বাংলা নতুন বছর কবে, কীভাবে প্রবর্তিত হলো? কে প্রথম পালন করেছিলেন? প্রবাসে এই সব বিতর্ক পাশে রেখে নতুন বছর উদ্যাপনের আনন্দটুটকুই ধরা থাকে। এখানে দেশের মতো হালখাতা হয় না। বছরের প্রথম দিন বসে না কোনো বটতলায় নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার আয়োজন। তবু আনন্দের কমতি নেই এখানে। অবশ্য ব্যবসায়িকভাবে বিভিন্ন সংগঠন কাছাকাছি সময়ে মেলার আয়োজন করে থাকে। সেটা অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো বিষয়। এর চেয়ে বরং পারিবারিক আয়োজনগুলো হয়ে ওঠে বেশি প্রাঞ্জল, বেশি আনন্দময়।
প্রবাসে নিজেদের পরিচিত মহলের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থানীয় পঞ্জিকার বিভিন্ন আয়োজনের পাশাপাশি দেশের আয়োজনগুলোও হয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। সবাই নিজের নিজের অবস্থান থেকে সেরাটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই সব আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা আসলে মেয়েরা। মেয়েরা সংসারের নিয়মিত ঘানি টানার পরও কীভাবে যে এমন সব সুচারু আয়োজন সম্ভব করেন, সেটা আমার কাছে এখনো এক বিস্ময়। আয়োজনের পাশাপাশি পরিবারের সব সদস্যের পোশাক থেকে শুরু করে খাবার—সবকিছুতেই থাকে তাঁদের তীক্ষ্ণ নজরদারি। পরিবারের সব বয়সী সদস্যকে আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারা তাঁদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
.আমাদের বন্ধুদের একটা মহল আছে। আমরা সবাই বাংলাদেশের একই প্রতিষ্ঠানের একই ব্যাচের, একই বিষয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। সংখ্যার হিসাবে সেটা বেশ বড়। শুধু সিডনিতেই আমাদের ২০ জন সহপাঠী বসবাস করেন। আমাদের মধ্যে কমবেশি যোগাযোগ হয় প্রায় সব সময়ই। আমাদের জমায়েতগুলো হয় খুবই প্রাণবন্ত। আমরা সহপাঠীরা যেমন নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিই, তেমনি আমাদের সহধর্মিণীরাও নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সহধর্মিণীদের বয়সও কাছাকাছি হওয়াতে তাঁদের মধ্যে বোঝাপড়াটা দারুণ। আর বাচ্চাকাচ্চাদের বয়সও কাছাকাছি হওয়াতে তাদের নিয়ে আলাদাভাবে মাথা ঘামাতে হয় না। এটা আমাদের জন্য একটা বিশাল আরামের ব্যাপার।
.দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com.
এবারের পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনকে ঘিরে মেয়েদের মধ্যে চলল বিশাল প্রস্তুতি। সেখানে আমাদের নারী সহপাঠীরাও অবিচ্ছেদ্যভাবে অংশ নিল। ছেলেদেরকে এবার শুধু রান্নার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এবারের আয়োজনের মূল বিষয় ছিল একেবারে বনভোজনের আদলে রান্না করে খাবার খাওয়া হবে। অবশ্য খাবারের অন্যান্য পদ এবং সাজসজ্জা সবাই নিজ নিজ বাড়ি থেকেই নিয়ে এসেছিল। মেয়েরা মঞ্চসজ্জার কাজও আগেই গুছিয়ে রেখেছিল। আয়োজনের দিন শুরুতেই বাচ্চাদের খেলাধুলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যাতে তারা পরবর্তী সময়ে নিজেদের মতো খেলতে পারে।
.এরপর মেয়েদের ও ছেলেদের আলাদাভাবে এবং যুগল খেলাধুলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এর মধ্যেই রান্নাও এগিয়ে গেছে সমানতালে। স্ন্যাকস জাতীয় খাবার তো আগে থেকেই আনা হয়েছিল। মূল রান্নার অংশে ছিল খিচুড়ি, ডিম ভাজি আর মাংশ। ডিম ভাজি আবার ছিল দুই রকমের—ঝাল ছাড়া ও ঝালসহ। যে যেমন ঝাল খায়, সে তেমন ডিম ভাজি পছন্দ করে নিতে পারবে, সে জন্যই এই ব্যবস্থা। খাওয়াদাওয়ার পর ছিল মিষ্টান্ন পরিবেশন। পয়লা বৈশাখে ইলিশ দিয়ে পান্তা খাওয়াটা বাংলাদেশের আপামর কৃষকের সঙ্গে ঠাট্টার শামিল। সেটাকে মাথায় রেখেই আয়োজন থেকে এই অংশটা বাদ দেওয়া হয়েছিল।
.প্রবাসের জীবনে জমায়েতগুলো অনেকটা শান্তিতে নিশ্বাস নেওয়ার উপলক্ষ। তবে পয়লা বৈশাখের আয়োজন সেখানে কিছুটা হলেও রঙের পরশ বুলিয়ে দেয়। মেয়েদের শাড়ি আর ছেলেদের পাঞ্জাবিতে দেশের বৈশাখের আবহ বিরাজ করে।
.বাচ্চাদের হুটোপুটি চলে মেলায় ঘুরে বেড়ানোর তালে। পুরো সাজসজ্জায় থাকে দেশ থেকে আনা সব উপকরণ। সেখানে নকশিকাঁথা থেকে শুরু করে চিড়া-মুড়ির মোয়া কোনো কিছুই বাদ পড়ে না। প্রবাসের এই আয়োজনগুলো দেশের বাইরে যেন একেকটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাংলাদেশ তৈরি করে।






