রঙিন হেয়ার ব্যান্ড বাঁধা মাথায় টমটমে মুখের সেই ছোট্ট সিদরাতুল জান্নাতের ছবি দেখিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা শানত কবির। বিকেলের লাল আলোয় বিষণ্ণ মুখখানি মুঠোফোনে ধরে তিনি বলেন, “ফুলের মতো মেয়েটাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না। ওর স্বপ্ন ছিল স্কুলের শিক্ষক হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না।”
গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ব্রেন টিউমারের দীর্ঘ লড়াইয়ে ১০ বছর বয়সী সিদরাতুল পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। আজ শনিবার বেলা দুইটায় জানাজা সম্পন্ন করে কক্সবাজারের রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের হাজিরপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
কক্সবাজার শহরের একটি হোটেলে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করেন সিদরাতুলের বাবা শানত কবির। মা আজিজা বেগম গৃহিণী। সহায়–সম্বলহীন এই পরিবার কচ্ছপিয়ার হাজিরপাড়া সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে থাকে। চার সন্তানের মধ্যে সিদরাতুল ছিল একমাত্র মেয়ে। তার অসুস্থতায় মা–বাবা দিশাহারা হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, অপারেশনের জন্য দরকার ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। যা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তবে সংবাদ প্রকাশের পর অনেকে এগিয়ে আসেন। তহবিলও জোগাড় হয়। কিন্তু সিদরাতুলকে বাঁচানো যায়নি।
প্রতিবেশী মো. সাজ্জাদ জানান, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে মানবিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশ–বিদেশ থেকে অনেকে সাহায্য করেন। প্রবাসী ও স্থানীয়দের সহায়তায় প্রায় আট লাখ টাকার তহবিল গঠিত হয়। ৫ এপ্রিল এই টাকা নিয়ে বড় ভাই মোহাম্মদ ইজাজ ছোট বোনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সবাই আশা করেছিলেন, সে সুস্থ হয়ে ফিরবে। কিন্তু সেই যাত্রাই তার শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়ায়।
তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন ছিল সিদরাতুল। তার চলে যাওয়ায় পরিবারে শোকের ছায়া নেমেছে। ভাই মোহাম্মদ ইজাজ বলেন, কচ্ছপিয়ার মৌলভিকাটা মাস্টারপাড়া তানফিজুল কোরআন মডেল মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত সিদরাতুল জান্নাত। প্রতিদিন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে মাদ্রাসায় যাওয়ার দৃশ্য এখন স্মৃতি হয়ে আছে। এসব বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
বোনের স্মৃতি তুলে ধরে ইজাজ বলেন, অসুস্থতার মধ্যেও সে বলত, সুস্থ হলে আবার পড়াশোনা করবে। বড় হয়ে আদর্শ শিক্ষক হবে। কিন্তু দেড় মাস আগে মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ে তার স্বাভাবিক জীবন থেমে যায়।
মেয়েকে হারিয়ে বাবা শানত কবির প্রায় উন্মাদের মতো। মা আজিজা বেগম শোকে কথা বলতেও পারছেন না। আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে মেয়ের কবরে একা শুয়ে আছে সে, এটা মেনে নিতে পারছেন না মা–বাবা।






