১৬ ডিসেম্বরের ভোরে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করা আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় সকাল। সূর্যোদয়ের সোনালি আলোয় জাপানের মাটিতে পা রাখা শুধু স্বপ্নপূরণই ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক প্রত্যাবর্তনের অনুভূতি। এই যাত্রা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে।

জাপান সরকারের আমন্ত্রণে আমরা বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন ও দুর্যোগ সহনশীলতা বিষয়ে বিশেষ সফরে অংশ নিয়েছি। এই দুই বিষয় আমাদের জাতীয় ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি হতে পারে।

বিমানবন্দর থেকে বাসে টোকিওর প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছে আমি বিস্মিত হয়ে যাই। বিশাল আধুনিক অবকাঠামোর মধ্যে নগরায়ণ ও প্রকৃতির অসাধারণ সমন্বয় আমাকে মুগ্ধ করে। মেট্রোতে চড়ে শিবুয়া ক্রসিংয়ে পৌঁছে আমাদের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর সঙ্গে স্পষ্ট পার্থক্য ধরা পড়ে। জাপানের গণপরিবহন নিঃশব্দ শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার অনন্য নিদর্শন, যা ব্যস্ত যাতায়াতকেও নাগরিক সৌন্দর্যে রূপান্তরিত করে।

টোকিওতে ফিরে সমাপনী উপস্থাপনার সময় আমি উপলব্ধি করি যে এই সফর শুধু একটি শিক্ষাসফর ছিল না; বরং এটি ছিল শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের একটি বাস্তব পাঠ।

শিবুয়া ও আকিহাবারার নিয়ন আলোয় ভরা এলাকা ঘুরে আমরা দেখি, টোকিও বাণিজ্যিক প্রাণচাঞ্চল্য ও নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে দক্ষতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করেছে। উচ্চ জনঘনত্ব সত্ত্বেও পরিকল্পিত সবুজ এলাকা ও জোনিং ব্যবস্থা নগরজীবন আরামদায়ক করে তুলেছে। এটি প্রমাণ করে, দ্রুত নগরায়ণ পরিবেশের ক্ষতি নয়, সঠিক পরিকল্পনায় মানুষ-প্রকৃতির সমন্বয় সম্ভব।

সফরের মূল শিক্ষা শুধু টোকিওর আধুনিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। জাপান ও বাংলাদেশ উভয়ই দুর্যোগপ্রবণ। দাইবা এলাকা, সোনা এরিয়ার দুর্যোগ প্রস্তুতিকেন্দ্র পরিদর্শন এবং এক জাপানি জলবায়ু বিশেষজ্ঞের বক্তব্য থেকে আমরা শিখি, কীভাবে জাপান ভৌগোলিক দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করেছে। উন্নত অবকাঠামো, পরিকল্পনা ও জনগণের অংশগ্রহণ তাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল।

টোকিও থেকে শিনকানসেন বুলেট ট্রেনে নাগানো প্রিফেকচার যাত্রা ছিল অবিস্মরণীয়। জানালায় পরিচ্ছন্ন গ্রামাঞ্চল ও মাউন্ট ফুজির দৃশ্য দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সম্মান একসঙ্গে চলতে পারে। ছোট শহরগুলোতে প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই জীবনযাত্রা অনুকরণীয়।

নাগানো ও হাকুবা ভিলেজে পরিবেশ সংরক্ষণের বাস্তবতা কাছাকাছি দেখি। নর্থ আল্পস ইকোপার্কে সুশৃঙ্খল বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার শিখি। জাপানে এটি সরকারি নীতি নয়, সংস্কৃতির অংশ। ছোটবেলা থেকে নাগরিকদের শেখানো হয়, পরিবেশ রক্ষায় সকলের দায়িত্ব। এই সচেতনতা তাদের পরিচ্ছন্নতার মূল কারণ, যা বাংলাদেশের নগরায়ণে গুরুত্বপূর্ণ।

জাপানি মানুষের আন্তরিকতা আমাদের স্পর্শ করেছে। হাকুবায় হোমস্টে স্থানীয় পরিবারের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী খাবার ভাগাভাগি, তুষারাচ্ছন্ন পাহাড়ে কেবলকার ভ্রমণ ও বিদায়ী অনুষ্ঠানে কিমোনো পরিধান—এসব ‘ওমোতেনাশি’র প্রকৃত অর্থ বুঝিয়েছে। ভাষা-আবহাওয়া সত্ত্বেও পরিবার, সমাজ ও সহযোগিতার মূল্যবোধ আমাদের বন্ধন গড়েছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com

টোকিওতে ফিরে সমাপনী উপস্থাপনায় উপলব্ধি করি, এই সফর শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও দায়িত্ববোধের পাঠ। এখানে মানুষ সমাজ, দেশ ও বৈশ্বিক পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল।

জাপান বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। সেতু থেকে ঢাকার মেট্রোরেল পর্যন্ত তাদের অবদান বিশাল। তবে এই সফরে বুঝেছি, তাদের সবচেয়ে বড় দান দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা। নাগরিক দায়িত্ব, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি গ্রহণ করলে বাংলাদেশ টেকসই ভবিষ্যতের পথে এগোবে।

ঢাকায় ফিরেছি স্মৃতি ও দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে। বাংলাদেশ-জাপান বন্ধুত্ব আরও মজবুত হবে—পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও টেকসই দুর্যোগ সহনশীল ভবিষ্যত গড়ার যৌথ প্রত্যয়ে।