আমার হাতে ছিল একটি পাথর—
মসৃণ, ঠান্ডা, নদীতে পাওয়া; আমি ভেবেছিলাম—
এটা চিরকাল থাকবে। কিন্তু একদিন হারিয়ে গেল—
কোথায় জানি না। আর এখন, বিশ বছর পরেও,
আমি মনে করতে পারি সেই পাথরের শীতল স্পর্শ—
যা আমার হাতে নেই, কিন্তু আছে আমার স্মৃতিতে,
যেখানে সময় তাকে আর ছুঁতে পারে না।
আমার বাবা একদিন বলেছিলেন—
‘জীবন একটা নদী, সে থামে না কখনো।’
তারপর তিনি চলে গেলেন—
নদীর মতোই, কোনো চিহ্ন না রেখে।
.কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর এখনো শুনি—
রাতের নিস্তব্ধতায়, বৃষ্টির শব্দে,
পাখির ডাকে ভোরবেলা; যা নেই,
সেই সব জায়গায় তিনি আছেন।
আমার মা একদিন রান্না করতেন—
হলুদ, জিরা, পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ ভাসত;
এখন তিনি নেই, রান্নাঘর ফাঁকা,
কিন্তু সেই গন্ধ—
সেই গন্ধ এখনো পাই কখনো কখনো,
যখন বাতাসে ভাসে কারও ঘরের রান্নার ঘ্রাণ।
যা থাকে, তা ধীরে ধীরে পুরোনো হয়—
জামা, জুতা, আসবাব, ঘর; কিন্তু যা থাকে না,
যা হারিয়ে যায়, তা চিরকাল নতুন থেকে যায়—
যেমন থেকে যায় একটি ছবি, যা তোলা
হয়েছিল বহু বছর আগে, কিন্তু সেই ছবিতে
আমরা কখনো বুড়ো হই না।
আমার দাদা মারা গেছেন সাতাত্তর বছর আগে—
আমার বয়স তখন মাত্র চার কি পাঁচ;
কিন্তু তাঁর হাসি মনে আছে—
সাদা দাড়ি, কুঁচকানো চোখ, উষ্ণ কোল।
.এবং সেই স্মৃতিতে তিনি এখনো পঁয়ষট্টি,
কখনো বুড়ো হননি আরও বেশি,
কখনো মলিন হননি আরও বেশি।
সময় যা ছুঁতে পারে, তা নষ্ট হয়;
কিন্তু যা সময়ের নাগালের বাইরে স্মৃতিতে—
তা অক্ষত থাকে, অমলিন থাকে।
আমার শৈশবের চারচালা টিনের ঘর ভেঙে
ফেলা হয়েছে—
এখন সেখানে একটি ছোট্ট দালান উঠেছে;
কিন্তু আমি এখনো দেখি সেই ঘর—
আমের গাছ, পুকুর, উঠোন, বারান্দা।
সেই কাঁচা ঘর এখন কোথাও নেই, কিন্তু সেই বাড়ি
সব জায়গায় আছে—
আমার প্রতিটি স্বপ্নে, প্রতিটি স্মৃতিতে।
এই পৃথিবী একটি বিচিত্র জায়গা—
যেখানে যা আছে, তা আমরা হারাতে থাকি,
এবং যা নেই, তা আমরা খুঁজে পেতে থাকি।
হয়তো এই-ই জীবন—
একটি ধীর ক্ষয়, একটি নিরন্তর বিদায়;
কিন্তু প্রতিটি বিদায়ের সাথে
জন্ম নেয় একটি চিরন্তন উপস্থিতি—
স্মৃতির ভেতর, হৃদয়ের ভেতর,
যেখানে সময় প্রবেশ করতে পারে না।
তাই আমি আর ভয় পাই না হারানোর—
কারণ, আমি জানি, যা হারায়
তা-ই সবচেয়ে গভীরভাবে থেকে যায়।
যা চলে যায়, তা-ই ফিরে আসে—
অন্যভাবে, অন্য রূপে, কিন্তু ফিরে আসে।
.এবং একদিন যখন আমি চলে যাব,
আমি জানি কেউ মনে রাখবে—
হয়তো আমার গলার স্বর, হয়তো আমার হাসি,
হয়তো একটি কথা যা আমি বলেছিলাম
এক বৃষ্টির দুপুরে। এবং সেই স্মৃতিতে আমি বেঁচে থাকব—
চিরকাল তরুণ, চিরকাল জীবিত,
সময়ের বাইরে, ক্ষয়ের বাইরে,
মৃত্যুর বাইরে। কারণ, যা থাকে না—
তা–ই থেকে যায়।
.দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com






