চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের ডোমখালী গ্রাম—ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে বেশ দূরের এক প্রত্যন্ত জনপদ, বঙ্গোপসাগরের খুব কাছাকাছি। শহরের কোলাহল বা আলোচনার কেন্দ্র থেকে অনেকটাই বাইরে থাকা এই গ্রামেই কয়েকজন কিশোর–তরুণের স্বপ্ন থেকে জন্ম নিয়েছিল একটি ছোট উদ্যোগ—ডোমখালী ব্লাডব্যাংক।
২০১৮ সালে স্থানীয় কয়েকজন তরুণ মিলে এই সংগঠন গড়ে তোলেন। তখনো দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়নি। গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে বা হঠাৎ রক্তের প্রয়োজন পড়লে অনেক সময়ই পড়তে হতো বিপাকে। শহরে যেতে সময় লাগত, আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে উপযুক্ত রক্তদাতা খুঁজে পাওয়াও ছিল কঠিন। সেই বাস্তবতা থেকেই মানবিক উদ্যোগ নেন গ্রামের তরুণেরা।
.শুরুটা ছিল একেবারেই ছোট। কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি তালিকা তৈরি করেন—কে কোন গ্রুপের রক্ত দিতে পারবেন। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে রক্তদাতার সংখ্যা। গ্রামের মানুষও ভরসা পেতে শুরু করেন এই তরুণদের ওপর। কোনো রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলে তাঁরা ছুটে যান, যোগাযোগ করেন এবং প্রয়োজনীয় রক্তের ব্যবস্থা করে দেন। পাশাপাশি বিনা মূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়সহ বেশ কিছু জনসেবামূলক কর্মসূচিও পরিচালনা করেছেন তাঁরা।
সময় গড়িয়েছে। সংগঠনের অনেক সদস্য এখন পড়াশোনা বা পেশাগত কারণে ছড়িয়ে পড়েছেন চট্টগ্রাম শহরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, কেউ চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। তবু থেমে নেই ডোমখালী ব্লাডব্যাংকের কার্যক্রম। গ্রামের কারও অসুস্থতা বা রক্তের প্রয়োজন হলে এখনো সক্রিয় হয়ে ওঠেন তাঁরা। ফোনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে রক্তদাতা খুঁজে বের করেন।
.এই ব্যস্ততার মধ্যেও বছরের একটি দিন তাঁরা একত্র হওয়ার চেষ্টা করেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের রমজানেও আয়োজন করা হয় ইফতার ও দোয়া মাহফিল। ডোমখালী ব্লাডব্যাংকের পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই ছোট পরিসরের আয়োজনটি ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রাণবন্ত।
সংগঠনের সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের উপস্থিতিতে ইফতার মাহফিলটি যেন হয়ে উঠেছিল এক আত্মিক মিলনমেলা। শুধু ইফতার নয়, মানবতার সেবায় নিজেদের অঙ্গীকার আরও একবার ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবেও দেখেছেন আয়োজকেরা।
ইফতার অনুষ্ঠানে সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়। কীভাবে আরও বেশি মানুষকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করা যায়, জরুরি সময়ে দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করা যায়—এসব বিষয় উঠে আসে আলোচনায়। পাশাপাশি রক্তদাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন সংগঠনের সদস্যরা।
.অনুষ্ঠানের শেষে দেশ ও মানুষের কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয়। সংগঠনের সদস্যরা বলেন, মানুষের বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোই তাঁদের মূল লক্ষ্য। সে লক্ষ্য নিয়েই তাঁরা এগিয়ে যেতে চান। ডোমখালী ব্লাডব্যাংকের তরুণদের ভাষায়—‘রক্তের বাঁধনে সাজাই দেশ, সেবায় মোদের নেই তো শেষ।’
সমুদ্রের ধারে ছোট্ট এক গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ হয়তো খুব বড় কোনো সংগঠন নয়। কিন্তু মানবতার গল্পগুলো প্রায়ই এমন ছোট জায়গা থেকেই জন্ম নেয়। আর সেই গল্পই মনে করিয়ে দেয়—দূরবর্তী গ্রামেও মানবতার আলো নিভে যায় না।
.নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com






